মোঃ সাইফ উদ্দিন রনী, কুমিল্লা ব্যুরো প্রধান:
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট সাতটি হাইব্রিড সহ একশো ছয়টি ধানের বীজ আবিস্কার করে। এর মধ্যে মিনিকেট নামের কোন ধান আবিস্কার হয়নি। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অধিক মুনাফার লক্ষ্যে চালে ভেজাল মিশিয়ে ভোক্তা সাধারনকে প্রতারিত করছে। এতে স্বাস্থ্যহানি সহ জটিল ও কঠিন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে জনসাধারন। ভেজালকারীদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা থাকা সত্ত্বেও সঠিকভাবে আইন প্রয়োগ না হওয়ার কারনে দিন দিন বেড়ে চলছে অসাধু ব্যবসায়ীর দৌরাত্ব।
কুমিল্লাতে ছোট বড় ৮২টি অটোরাইস মিলের কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে জেলার বুড়িচং ইউনিয়নের ভারেল্লা ইউরিনয়নে অধিকাংশ চাল কল অবস্থিত। বিশেষ করে পারুযার, রামপুর, কংশনগর, গোবিন্দপুরের মিলগুলে কুমিল্লার চাল শিল্পে উল্লেখযোগ্য। এ অঞ্চলটি চালের জন্য এখন দেশের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিনত হচ্ছে একাধারে চাল উৎপাদন, উন্নত জাতে রূপান্তর ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে। সেখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় হাজার-হাজার টন চাল উৎপাদিত হয়। হাজার টন চাল মজুদ রাখার মতো শত শত গুদামও গড়ে উঠেছে । ধান আনা, সেদ্ধ, শুকানো, চাল তৈরি করা সব মিলিয়ে রাত-দিন চলছে নারী-পুরুষ শ্রমিকের বিশাল কর্মযজ্ঞ।
বুড়িচংয়ে উৎপাদিত চালের সুনাম রয়েছে। অথচ এ সুনামকে পুঁজি করে একশ্রেনীর প্রতারক এ জায়গার চাল ব্র্যান্ড ব্যবহার করে খারাপ চালের জমজমাট ব্যবসা শুরু করেছে। এসব ব্র্যান্ডের চাল কিনে ঠকছেন ক্রেতারা। সাধারন থেকে শুরু করে মিনিকেট চাল পর্যন্ত বাজারজাত করে চলেছে অসাধু এই ব্যবসায়ী চক্র। সংশ্লিষ্ট মিল-মালিক ও ব্যবসায়ীরা বলেন, একশ্রেনীর অতি মুনাফালোভী দুষ্টচক্রের যোগসাজশে এখানকার প্রতারকরা ছোট-বড় ব্যাগে নানা বেনামে, নানা ব্র্যান্ডে সিলমোহরের মাধ্যমে দেদারছে নিন্মমানের চাল ছাড়ছে বাজারে। এখানকার চাল ঢাকা, চট্টগ্রাম, বিবাড়িয়া, সিলেট ও ফেনীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি হচ্ছে।
কংশনগর বাজারের মেসার্স সুমন অটো রাইস, রামপুরার হাবিব এন্ড রফিক অটো রাইমমিল, ফেমাস অটো রাইস মিল, শাপলা রাইস মিল, বিসমিল্লাহ অটো রাইস মিল, মেসার্স ভুইয়া অটো রাইস মিলসহ রুবেল এগ্রে ফুড ইন্ডাস্ট্রিজের কুষ্টিয়ার ১নং মিনিকেট চাল, সুপার মিনিকেট, হাসমার্কা সুপার মিনিকেট চাল, বি আর ২৮, ছাতা মার্কা চাল, হাঁস মার্ক সুপার পারিজা চাল, আনারস মার্কা চাউল, মোরগ মার্কা সুপার মিনিকেট চাউল, গোলাপফুল, সুপার মিনিকেট চাউল বিক্রি হয়।
এদিকে অটোরাইস মিলগুলো ২৮ এবং ৩২ ধানকে ছাটাই করে মিনিকেট চালে রূপান্তর করার জন্য বিষাক্ত পাউডার, পটাশ, ইউরিয়া সার ও মোম পালিশ করা হচ্ছে। এতে চাল দেখতে সুন্দর ও চিকন হয়। চালে ভেজাল মিশানোর কারণে দিন দিন বেড়ে চলছে স্বাস্থ্যহানি। প্রতিবন্ধি, বিকলাঙ্গ ও মানসিক রোগের প্রাদূর্ভাব বেড়েই চলছে।
১৮৬০, ১৯৭৪, ২০০৩, ২০০৫ সর্বশেষ ২০০৯ সালে সংশোধিত আইনসহ ভেজালকারীদের তিন লক্ষ টাকা ও ১ বছরের সশ্রম কারাদন্ড। দোকান বা কারখানার যন্ত্রপাতি বাজেয়াপ্ত করার বিধান রয়েছে। সংশোধনী আইনসহ ভেজাল প্রতিরোধের প্রয়োগ না থাকার কারনে দিন দিন বেড়েই চলছে অসাধু ব্যবসায়ীর দৌরাত্ব।
হাবিব এন্ড রফিক অটো রাইস মেইলের মালিক জসিম উদ্দিন চৌধুরী জানান, মিনিকেট চালের চাহিদা বেশী তাই মেশিনের মাধ্যমে মোটা চাল গুলোকে একটু পরিবর্তন করে চিকন করা হয়। এত ক্ষতির কোন কারন দেখছিনা।
মেসার্স অটো রাইস মেইলের মালিক হুমায়ূন কবির ভূইয়া জানান, এখানকার রাইসমিলগুলো সাধারনত বি-বড়িয়া, সিলেট, নেত্রকোণা, ও কুমিল্লার বিভিন্ন উপজেলা থেকে ধান সংগ্রহ করে। এখানে চালগুলোকে একটু পরিষ্কার করা হয়। চালের উপরের আবরনগুলোকে। চালের উপরে যে প্রলোপ থাকে তাতে ভাতের মারের সাথেও চলে যায়।
নগরীর চকবাজারে চাল ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম জানান, বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মিনিকেট চালের দেখা মিললেও দেশে মিনিকেট ধানের কোনো আবাদ নেই। মোটা চাল মেশিনে চিকন করে মিনিকেট নামে বিক্রি করছেন মিল মালিকেরা। মানুষের চাহিদা রয়েছে তাই আমরা বিক্রি করি।
সামাজিক ব্যক্তিত্ব মফিজুল ইসলাম বলেন, যারা এমন প্রতারনা করেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবী করব। দেশের একটা নীতিমালা আছে, সবকিছুই নিয়মনীতির মাধ্যমে চলে। ভোক্তাদের সাথে প্রতারনা করলে ভোক্তা অধিদপ্তর এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের নিউরো মেডিসিন ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ সৌমিত্র দাস বলেন, বর্তমানে বাজারে যে মিনিকেট চাল আছে তার সঙ্গে ইউরিয়া সার পটাস, এবং চালকে ধবধবে করার জন্য মোম ব্যবহার করা হচ্ছে এর ফলে দীর্ঘ মেয়াদী প্রতিক্রিয়ায় শরীরে ক্যানসার, কিডনী ও যকৃতে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এছাড়া অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্তের সম্ভবনা রয়েছে। গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেতে ঝুকিটা একটু বেশি। তাদের ক্ষেত্রে বিকলাঙ্গ ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশু সন্তান জন্ম দেওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট কুমিল্লার চীফ সাইন্টিফিক অফিসার ড. আমিনুল ইসলাম বলেন, ধান গবেষনা ইনষ্টিটিউট ৭ টি হাইব্রিডসহ ১০৬ টি ধান গবেষনায় অবিষ্কার করেছেন। আসলে মিনিকেট বলতে বাংলাদেশে কোন জাত নেই। আউটার লেয়ারটাকে কেটে চিকন করা হয়। এতে করে পুষ্টি উপাদানগুলো চলে যায়। বিশেষ করে আয়রন জিংক ভিটমিন এ জাতীয় উপাদানগুলো চালের বাহিরে থাকে. মোটা চাল ভেঙ্গে চিকন করার পর এটা আমরা আর পাচ্ছিনা। মিনিকেট নামে আমাদের সাথে প্রতারনা করা হচ্ছে। এ নিয়ে প্রশাসনের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
জাতীয় ভোক্তা অধিদপ্তর কুমিল্লার পরিচালক মোঃ আসাদুল ইসলাম বলেন, বাজারে মিনিকেট নামে যে চালটা প্রচলিত আছে এটা আসলে কোন জাত না। এটা প্রতারনা করে ভোক্তাদের দেওয়া হয়। ভোক্তা অধিদপ্তর মানুষের স্বাস্থ্যর ঝুকিতে ফেলে কোন পন্য উৎপাদন বাজার জাতকরনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করে। এ ধরনের প্রতারনার বিরুদ্ধে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি এবং তা অব্যাহত থাকবে। শীঘ্রই ভেজালকারীদের আইনের আওতায় আনা হবে।
Leave a Reply