ইয়ামিন হোসেন পাটোয়ারী, কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিনিধি
করোনার প্রকোপে গত ১৭ মার্চ, ২০২০ খ্রিঃ থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। দীর্ঘ এ বন্ধে দেশের সকল স্তরের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। ভালো নেই মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকগণ। বিশেষ করে ব্যক্তি মালিকানাধীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকগণের অবস্থা খুবই দুর্বিষহ।
গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার ব্যক্তিমালিকানাধীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত একাধিক শিক্ষকের সাথে কথা বলে তাঁদের জীবনযাপনের নানা চিত্র উঠে আসে। চিত্রশিল্পী শাহআলম সরকার সফিপুর আইডিয়াল পাবলিক স্কুল, হাতেখড়ি পাবলিক স্কুল, হাজী আহমেদ আলী পাবলিক স্কুল ও লতিফপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। চিত্রাংকন শেখানোই ছিল তাঁর পেশা ও নেশা। এ পেশাই ছিল তাঁর একমাত্র উপার্জনের মাধ্যম। করোনাকালীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধে তিনি অসহায় হয়ে পড়েছেন। টাকা-পয়সার অভাবে তাকে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বর্তমানে তিনি ‘রাইড শেয়ারিং’ কাজে ভাড়ায় মোটরবাইক চালান। তিনি বলেন, “আমি স্ত্রী-সন্তানকে ঠিকমতো খাবার দিতে পারছি না। তাদের ভরণপোষণের কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছি না। তাই বাধ্য হয়ে মোটরবাইক নিয়ে রাস্তায় নেমেছি। স্নাতকোত্তর পাশ করে একজন অশিক্ষিত মানুষকেও আমাকে ভাড়ায় এক জায়গা থেকে অন্যত্র নিয়ে যেতে হয়। আমি আর পারছি না। সরকারের কাছে জোড়ালো দাবি,শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অতি তাড়াতাড়ি খুলে দিন।”
বাড়ইপাড়া আইডিয়াল পাবলিক স্কুলের সিনিয়র শিক্ষক মোঃ হাসান আলী ১৫ বছর ধরে শিক্ষকতা পেশায় নিয়জিত। করোনার এহেন পরিস্থিতিতে তাঁর আয়-রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে যায়। নিরুপায় হয়ে তিনি টেইলারিং দোকান দিয়ে জামা-কাপড় তৈরি করেন।
সেতু সেন্ট্রাল স্কুলের সহকারী শিক্ষক মোঃ নজরুল ইসলাম বলেন, “শিক্ষকতার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ দিয়ে জীবিকানির্বাহ করতাম। করোনার বন্ধে সে পথ রুদ্ধ হওয়ায় কাওমি মাদ্রাসায় গণিত, ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছি। মাদ্রাসা থেকে সামান্য বেতন পেয়ে খুব কষ্টে জীবনযাপন করতে হচ্ছে। কবে যে প্রতিষ্ঠান খুলবে সে অপেক্ষার প্রহর গুণছি প্রতিনিয়ত।”
সফিপুর আইডিয়াল পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান মোঃ হাবিবুর রহমান বলেন, ‘শিশুদের নৈতিক শিক্ষা ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিকল্প নেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় বাচ্চাদের উপর অনেকটাই প্রভাব ফেলছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাবে শিশুদের আচরণগত পরিবর্তনও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অপরদিকে আমাদের মতো ব্যক্তি মালিকানাধীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকগণের অবস্থা অনেকটা সংকটাপন্ন। তাঁদের মাসিক বেতন দেওয়ার মতো সক্ষমতা বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের নেই। এমতাবস্থায় নিরুপায় হয়ে শিক্ষকদের অনেকেই অন্য কর্মের সন্ধানে ব্যস্ত। শিক্ষাক্ষেত্রে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার একটা আশংকা রয়ে যায়। সার্বিক বিবেচনায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে অনতিবিলম্বে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার দাবি সরকারের কাছে।”
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বন্ধ আর না বাড়িয়ে ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে অবিলম্বে খুলে দেওয়ার জোড়ালো দাবি জানান কালিয়াকৈর উপজেলার শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সচেতন মহল। শিক্ষার্থীদের কোলাহলে উজ্জীবিত হোক সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থীদের মাঝে অতিসত্বর ফিরে আসুক শ্রেণি শিক্ষার প্রতিযোগিতা এমনটাই প্রত্যাশা করেন সর্বস্তরের জনগণ।
Leave a Reply