এম শাহীন আল আমীন,জামালপুর॥
জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে একই পরিবারে ছয় জনের মধ্যে বাবাসহ চার জনই প্রতিবন্ধী হওয়ায় সংসার চলছে তাদের প্রতিবন্ধী ভাতায়। সংসারের একমাত্র উপার্জক্ষম ব্যক্তি বাবা আব্দুর রহমান রহিম নিজেও শারিরীক প্রতিবন্ধী। বয়স ৬০ ছুঁই ছুঁই। কাজ কর্ম করতে পারেন না। তার ওপর দুই মেয়ে ও এক ছেলে তার মতোই শারিরীক প্রতিবন্ধী হওয়ায় তাদের নিয়ে বিপাকে পড়েছেন দরিদ্র বাবা-মা। তাদের লেখাপড়া, চিকিৎসা, খাওয়া-পড়ার ব্যয়ভার বহন করতে না পাওয়ার বেদনায় অস্ফুট কান্নায় ভেঙে পড়েছেন তারা।
জানা গেছে, উপজেলার চুকাইবাড়ী ইউনিয়নের বীর হলকা গ্রামের আব্দুর রহমান ওরফে আব্দুর রহিম জন্ম থেকে শারিরীক প্রতিবন্ধী। দুই ছেলে দুই মেয়ে ও স্ত্রীসহ ছয় জনের সংসারে সে-ই একমাত্র উপর্জক্ষম। ২০১৩সালে যমুনার গর্ভে বসতবাড়ী আবাদী জমি বিলীন হলে কোনো উপায়ান্তর না পেয়ে বর্তমানে দেওয়ানগঞ্জ রেল স্টেশনের উত্তরপাশে ও বালুগ্রাম মৌলভী বাজারের দক্ষিণে মাঝ বরাবর রেল লাইনের ধারে সরকারী জমিতে ঘর তুলে চার ছেলে মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে গাদাগাদি হয়ে মানবেতর জীবন যাপন শুরু করেন। নদী গর্ভে জমাজমি চলে যাওয়ায় অন্ন -ব¯্ররে সন্ধানে মূহ্যমান আব্দুর রহিম অন্যের জমি বর্গাচাষ করে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাতে থাকেন। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, এরই মধ্যে ঘরে আসে চার সন্তান। তার মধ্যে তিন জনই শারিরীক প্রতিবন্ধী। বড় মেয়ে রুবিনা, বয়স ২৪ বছর। সে শারিরীক প্রতিবন্ধী। দ্বিতীয় সন্তান রহিমা আক্তার, বয়স ১৭ বছর। সে-ও শরিরীক প্রতিবন্ধী। তৃতীয় সন্তান ১৫ বছরের শরিফ প্রতিবন্ধী না হলেও চতুর্থ সন্তান রিপন (১২) দুই বোনও বাবার মতোই শারিরীক প্রতিবন্ধী।
প্রতিবন্ধী আব্দুর রহমান ওরফে আব্দুর রহিমের তিন সন্তান প্রতিবন্ধী হলেও তাদের রয়েছে লেখাপড়া করে নিজের পায়ে দাঁড়াবার অদ্যম ইচ্ছে। স্থানীয় প্রতিবন্ধী শিশু শিক্ষা ও পরিচর্যা সমিতি প্রশিপস্ তাদের শিক্ষা দিয়েছে প্রতিবন্ধীরাও মানুষ। তাদেরও রয়েছে সমাজের অন্য দশ জনের মতো অধিকার। সেই সূত্র ধরে বড় মেয়ে রুবিনা প্রতিবন্ধীতা নিয়েই এবার স্থানীয় কলেজে বিএসএস তৃতীয় বর্ষে পড়ছেন। মেজো মেয়ে রহিমা এইচএসসি পরীক্ষা দেবে এবং প্রতিবন্ধী ছোট ছেলে রিপন দেওয়ানগঞ্জ সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে ৭ম শ্রেণিতে পড়ছে। সমাজের অন্য দশ জনের মতো অধিকার নিয়ে বাঁচতে হলে লেখাপড়ার কোনো বিকল্প নেই। এই ভেবে প্রতিবন্ধীতার বোঝা গা থেকে ঝেরে ফেলে লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হতে চায় তারা।
রুবিনা আক্তার বলেন, আমি শারিরীক প্রতিবন্ধী। কিন্তু আমিও সমাজের অন্য দশ জনের মতো মানুষ। বিয়ে হয়েছে বছর খানেক আগে। তবুও বড় হওয়ার প্রত্যয়ে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছি। আমার ছোট ভাই বোনদেরকেও লেখাপড়া করার উৎসাহ দিচ্ছি। তারাও লেখা পড়া করছে।
প্রতিবন্ধী আব্দুর রহমান ওরফে আব্দুর রহিমের রেল লাইনের ধারে টিনের ছোট একটি চৌচালা ঘর। তাতে চার সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে গাদাগাদি হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। বড় মেয়ে রুবিনা প্রতিবন্ধী হলেও অন্য এক হালকা দৃষ্টি প্রতিবন্ধীর সাথে পাত্রস্থ হয়েছে। অন্য মেয়ে রহিমা সমত্ত। তার বিয়ে দেওয়া নিয়ে ভাবছেন প্রতিবন্ধী বাবা আব্দুর রহিম ও তার স্ত্রী শরিফা বেগম। প্রতিবন্ধী বলে কে দয়া করে রহিমাকে ঘরে তুলে নেবে?
আব্দুর রহিমের সংসার চলছে এখন প্রতিবন্ধী তিন ছেলে মেয়ে ও নিজের প্রতিবন্ধী ভাতার ওপর নির্ভর করে। অন্যের জমি বর্গা চাষ করে ও প্রতিবন্ধী ভাতায় জীবন চললেও তাদের স্বপ্ন দুর্বার ও অদম্য। প্রতিবন্ধী ছেলে মেয়েদের প্রতিবন্ধীতাকে পেছনে ফেলে লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ করার স্বপ্নের দুর্বার গতি নিয়ে প্রতিবন্ধীতার মাঝেও সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন আব্দুর রহিম।
কান্না জড়িত কণ্ঠে রহিমা আক্তার বলেন, প্রতিবন্ধী হলেও আমরা মানুষ। অভাব অনটনে জর্জরিত হলেও লেখাপড়া ছাড়িনি। লেখাপড়া করে অন্য দশ জনের মতো মানুষ হতে চাই। যদিও আমাদের লেখাপড়া করানোর মতো সাধ্য প্রতিবন্ধী দরিদ্র বাবা-মার নেই। তথাপীও লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছি। সরকার প্রতিবন্ধী ভাতা দিচ্ছে । সে ভাতার টাকায় উচ্চ শিক্ষা লাভ করে চাকুরী করে সমাজকে দেখাবো প্রতিবন্ধী হলেও আমরাও পারি।
আব্দুর রহিম বলেন, যমুনার গর্ভে বতসভিটা আবাদী জমি বিলীন হওয়ায় আজ আমি নিঃস্ব। সরকার আমাদেরকে প্রতিবন্ধী ভাতা দিচ্ছে। শত অভাব অনটনের মাঝে প্রতিবন্ধী ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া করে দাঁড় কারাবো সামাজের উচ্চ আসনে।
উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন বলেন, প্রতিবন্ধী হলেও রুবিনা, রহিমা ও রিপনের মেধা ভালো আছে। লেখাপড়া করারও ইচ্ছে রয়েছে। এ বিষয়ে আমাদের পক্ষ থেকে সর্বাতœক সহায়তা করা হবে।
Leave a Reply