রকিবুজ্জামান, মাদারীপুর জেলা প্রতিনিধি :
দর্জি মনিরের মাদারীপুরের কালকিনির বাড়ির বেড়ায় ঝুলছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নেতার সঙ্গে ওঠা-বসার ছবি। অথচ মাদারীপুর জেলা আওয়ামীলীগ অথবা কালকিনি উপজেলা আওয়ামীলীগ নেতা-কর্মীরাই কেউ তাঁকে চেনে না। নিজ এলাকার মানুষের কাছেও তিনি এখন এক বিতর্কিত ব্যক্তি।
দর্জি মনির কীভাবে হলেন জাতীয় নেতা, কেনই বা তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলো? এ নিয়ে তাঁর নিজ গ্রাম মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের জায়গীর গ্রামে চলছে ব্যাপক গুঞ্জন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কালকিনির লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের জায়গীর গ্রামে একটি আধপাঁকা রাস্তার পাশে মনির খানের বাড়ি। বাড়িতে টিনের একটি দো-চালা ঘর। ঘরে ঢুকতেই থরে থরে সাজানো একের পর এক ছবি। কোনটায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে মনির। কোনটায় দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কুশন বিনিময় করছেন। কোন ছবিতে নেতাদের মাথার ওপরে হাত উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। এমন দৃশ্য ঘরের পুরো বেড়া জুড়ে। অভিযোগ উঠেছে, এসব ছবি কম্পিউটারের কারসাজিতে তৈরি করা হয়েছে। কিছু কিছু ছবিতে স্পষ্টই বোঝা যায় কৃত্রিম কাজের চিহ্ন।
গ্রামের একাধিক বাসিন্দা ও তার আত্মীয়-স্বজন জানান, জায়গীর গ্রামের খান বাড়িতে হারুন খানের ঘরে মনির খানের জন্ম হয়। মনিরের বয়স প্রায় ৪২ বছর। তার দুই ভাই ও তিন বোন রয়েছে। তার ৫ চাচা রয়েছে, মনিরের বাবা সবচেয়ে বড়। তাঁর পরিবার এলাকায় কিছুটা প্রভাবশালী হওয়ায় ছোট থেকেই মনির কিছুটা ডানপিটে স্বভাবের। ২০-২২ বছর বয়সেই তিনি বিয়ে করেন। এর কিছুদিন পরে স্ত্রী নাসিমা বেগমকে নিয়ে ঢাকা চলে যান। স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে তিনি কখনোই জড়াননি। স্থানীয় সূর্যমনি বাজারের একটি জায়গা দখল করার চেষ্টারও অভিযোগ রয়েছে মনিরের বিরুদ্ধে।
মনির খানের প্রথম স্ত্রী নাসিমা বেগম বলেন, ‘আমার সঙ্গে মনিরের বিয়ে হয় প্রায় ১৫ বছর আগে। তারপরে কয়েক বছর আমরা ঢাকাতে থেকেছি। তখন দেখতাম তিনি রাজনীতি করেন। এরপর সাত-আট বছর ধরে আমি বাড়িতে আমার এক মেয়ে নিয়ে থাকি। মনির ঢাকাতে আবার বিয়ে করেছে। তিন-চার মাস পরে মাঝে মাঝে বাড়িতে আসে। মাস গেলে বিকাশে সংসার খরচ পাঠায়। আমি এর চেয়ে বেশি কিছু জানি না। শুনছি, ঢাকায় রাজনীতির কারণে গ্রেপ্তার হয়েছে। আমি সেসবের খবর রাখি না। তার ঢাকার স্ত্রী সব দেখা-শোনা করছে।’
এ বিষয়ে মনিরের ছোট চাচা শহিদুল ইসলাম খান জানান, কিছুদিন পর পর বাড়িতে এসে ছবিগুলো মনির নিজেই ঘরে সাঁটিয়ে রেখে যেত।এলাকায় তেমন নাম-ডাক নেই বললেই চলে।”
তবে স্থানীয় লোকজন মনিরকে চেনে বিতর্কিত ব্যক্তি হিসেবেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, ‘মনির একটা টাউট প্রকৃতির লোক। মাঝে মাঝে এলাকায় এসে খালি ছবি টাঙাতো। বাজারের জায়গা দখলের চেষ্টা করেছিল একবার। পরে ধাওয়া খেয়ে ঢাকা গেছে। এমন লোকের তো আগেই গ্রেপ্তার হওয়া উচিত ছিল।’
এ ব্যাপারে কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সংরক্ষিত মহিলা আসন-৪২ এর সংসদ সদস্য অধ্যাপিতা তাহমিনা সিদ্দিকী বলেন, ‘মনিরদের মতো ব্যক্তিদের কারণে তৃণমূল পর্যায়ে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এরা দলের জন্য ক্যান্সারস্বরূপ। সংগঠনের সঙ্গে এদের কোন সম্পৃক্ততা নেই। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি করছি।
প্রসঙ্গত, গত ২ আগস্ট ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ মনির খান ওরফে দর্জি মনিরকে গ্রেপ্তার করেন। চার দিনের রিমান্ড শেষে মনির বর্তমানে জেল-হাজতে রয়েছে। তাঁর গ্রেপ্তারের খবরে এলাকায় চলছে নানা গুঞ্জন, দলীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করায় শান্তির দাবি রাজনৈতিক মহলের।
Leave a Reply