এম শাহীন আল আমীন, জামালপুর।।
জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলায় বেড়েই চলেছে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের পরিসংখ্যান। এরপরও করোনা প্রতিষেধক টিকা নিতে অনিহা পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিপরীতে মহামারি করোনাকে তোয়াক্কা করছেন না উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ। অজ্ঞতা, বোধশক্তি আ সচেতনতার অভাবে যে যার মতো পারছে, সেভাবেই চলাফেরা করছে। মানছে স্বাস্থ্যবিধি। ফলে করোনা থেকে সুরক্ষায় টিকা গ্রহণে পিছিয়ে রযেছেন প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষেরা।
অথচ বর্তমানে উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা করোনা উপসর্গের রোগীর অধিকাংশই গ্রাম থেকে আসছেন। যাদের কেউ টিকা নেননি। এমনকি তাঁদের পরিবারেরও কেউ এখনো টিকা গ্রহণ করেনি।
টিকাদান কর্মসূচির শুরু থেকে এ পর্যন্ত নিবন্ধনের তথ্য বিশ্লেষণ ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
সচেতন মহলের অভিমত, টিকা নিতে আগ্রহ সৃষ্টি করতে প্রয়োজন করোনার মহামারি দাপট এবং টিকার সুফল বিষয়ে প্রত্যান্ত গ্রামে সভা-সমাবেশ জরুরি।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এ উপজেলায় দিনদিন বেড়েই চলেছে করোনা সংক্রমণের হার। গত ৪ লা আগস্ট পর্যন্ত ২ হাজার ৩০৫ জনের নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠালে তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩২৮ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিসংখ্যানবিদ সাইফুল ইসলাম জানান, এ উপজেলায় করোনা প্রতিষেধক টিকা শুরু হয়েছে গত ৭ ফেব্রুয়ারি। এ সময় টিকার ১ ম ও ২য় ডোজ সম্পন্ন করেন ৭ হাজার ৭২ জন মানুষ। টিকা দ্বিতীয় দফায় শুরু করা হয়েছে গত ১২ জুলাই। শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল নয়টা থেকে দুপুর পর্যন্ত টিকা প্রদান করা হয়। গত ৪ আগস্ট বেলা এগারোটা পর্যন্ত টিকার ১ম ডোজ দেয়া হয়েছে ২ হাজার ৪২৩ জনকে।
বুধবার (৪ আগস্ট) সকালে উপজেলা হাসপাতালে স্থাপিত টিকাদান কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, টিকা গ্রহণের জন্য অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ অপেক্ষা করছেন টিকা নেওয়ার জন্য। টিকা নিতে গ্রহীতাদের অধিকাংই ছিলেন শহরের বাসিন্দা।
টিকা নিতে আসা আলী হোসেন বলেন, ‘টিকা নেওয়ার কোনো বিকল্প দেখছি না। সে জন্যই টিকা দিতে এসেছি।’
সালমা বেগম বলেন, ‘ নিজে চাকুরী করি। টিকা দিয়ে এখন নিজেকে ভারমুক্ত মনে হচ্ছে।’
টিকা প্রদান কেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, এ পর্যন্ত যারা টিকা দিতে এসেছে, তাঁদের বেশির ভাগই শহরের বাসিন্দা এবং শিক্ষিত ও চাকুরিজীবী। গ্রামাঞ্চলের মানুষ অনেক কম টিকা নিতে আগ্রহী।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. আরিফুর রহমান বলেন, ‘আমরা বর্তমানে গ্রামাঞ্চলের রোগী বেশি পাচ্ছি। যাদের কারোরই টিকা নেওয়ার ইতিহাস নেই। এমনকি তাঁদের স্বজনেরাও টিকা নেননি। এটি একটি ভয়াবহ অবস্থা।’
তিনি আরও বলেন, শুধু শহরের মানুষ টিকা নিলে লাভ হবে না। গ্রামের মানুষকেও এই টিকার আওতায় আনতে হবে। তা নাহলে করোনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।’
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ১২ টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় ৪ লক্ষাধিক লোকের বসবাসের এ উপজেলার গ্রামের অনেক মানুষ যেমন টিকা নিতে অনাগ্রহী, তেমনই তাঁরা করোনা রোধে জনসচেতনতা থেকেও পিছিয়ে রয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, কঠোর লকডাউনেও হাজারে হাজারো মানুষের সমাগমে গরু-ছাগল ক্রয়-বিক্রয়ের হাট চলার।
করোনা নির্মূল, নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সচিব, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এ এ এম আবু তাহের বলেন, ‘করোনায় সংক্রমণ ও মৃত্যু হার এখন ঊর্ধ্বমুখী। এ ক্ষেত্রে গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষকে করোনার টিকার আওতায় আনতে আমরা কাজ করছি। আমাদের টিকাদান কেন্দ্রে গ্রামের অনেক রোগী এবং তাঁদের স্বজনকে নিবন্ধন করিয়ে দিচ্ছি। অনেককে শিখিয়ে দিচ্ছি হচ্ছে কোথায় কীভাবে নিবন্ধন করতে হবে।’
সমাজহিতৈষী দরিয়াবাদ সেবা সংগঠনের সভাপতি মো. সাজু মিয়া বলেন, ‘গ্রামের মানুষ করোনার দাপট আমলে নিতে চায় না। এক্ষেত্রে প্রয়োজন করোনার মহামারি এবং টিকার সুফল বিষয়ে প্রত্যান্ত গ্রামে গ্রামে গিয়ে সভা-সমাবেশ করা জরুরি।
হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির উপদেষ্টা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এস এম জামাল আব্দুন নাছের বাবুল বলেন, ‘গ্রামের লোকদের টিকার আওতায় আনতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। প্রতিটি ইউনিয়নে টিকা কেন্দ্র স্থাপন করে টিকা দিতে স্বাস্থ্যকর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
করোনা নির্মূল, নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে মাঠে তদারকির দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. রোকনুজ্জামান খান বলেন, ‘আমি করোনা রোধে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে প্রতিদিনই অভিযান চালাচ্ছি।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. গোলাম মোরশেদ বলেন, পিছিয়ে পড়া গ্রামের মানুষকে টিকার আওতায় আনতে স্বাস্থ্যকর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে মাঠ কর্মীদের নামানো হয়েছে নিবন্ধ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য। আশা রাখি, দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রত্যান্ত অঞ্চলের মানুষাও টিকারা আওতায় আসবে।’
Leave a Reply