বিল্লাল হোসেন,যশোর প্রতিনিধি
প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস খুব সহজেই মানুষকে দুর্বল করতে পারে। দীর্ঘ চিকিৎসাসেবার মধ্যে অনেকেই চলে যাচ্ছে না ফেরার দেশে। আর সাথে যুদ্ধ করে যারা সুস্থ হওয়া মানুষগুলো ক্ষণে ক্ষণে অনুভব করে করোনার কঠিন যন্ত্রনা। এমনি একজন হলেন যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান। করোনার ছোবলে দীর্ঘ যন্ত্রনা ভোগ করেছেন। ভয়কে জয় করে এখন করোনায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে তার আপ্রাণ চেষ্টা। এখানে যোগদানের পর থেকে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে তার নিরন্তর ছুটে চলা। চিকিৎসাসেবার জন্য রোগীদের দুর্ভোগ ও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে না। করোনাকালে নিজের জীবন বাজি রেখে বিশেষ ভূমিকার জন্য ইতিমধ্যে ডা. আখতারুজ্জামান প্রশংসিত হয়েছেন।
জানা গেছে, ঝিনাইদহের ম্যাটসে সহকারি পরিচালক (এডি) হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন গত ৪ এপ্রিল পরিবারের ৫জন সদস্যসহ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন ডা. আখতারুজ্জামান। হোম আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ১৩ এপ্রিল করোনামুক্ত হন তিনি। করোনা জয় করার পর ২৭ এপ্রিল যোগদান করেন কর্মস্থলে। সেই থেকে ছুটে চলা শুরু। এরপর ১ জুন যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে যোগদানের পর থেকে তার দায়িত্ব বেড়ে যায় বহুগুণে। করোনায় আক্রান্ত রোগীদের খোঁজ নেয়ার পাশাপাশি প্রতিদিন ছুটে যান রোগীদের পাশে । তাকে দেখে অন্য চিকিৎসক সেবিকা ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মনোবল বাড়ছে। ফলে চিকিৎসাসেবার জন্য রোগীদের দুর্ভোগ ও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে না। তত্ত্বাবধায়ক ডা. আখতারুজ্জামান জানিয়েছেন, মরনব্যাধি করোনাভাইরাস আতঙ্ক সবার মাঝে রয়েছে। তিনিও এর বাইরে নন। তারপরেও মানুষের কথা চিন্তা করে তার এই ছুটে চলা। হাসপাতালের প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে তার অনেক দায়িত্ব রয়েছে। করোনা মহামারীর এই সময়ে অফিসে বসে থাকলে চলবে না। করোনায় আক্রান্তরা যেনো চিকিৎসাসেবায় অবহেলার শিকার না হয় সেই বিষয়ে খোঁজ রাখা নৈতিক দায়িত্ব।
হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী জানান, তত্ত্বাবধায়ক ডা. আখতারুজ্জামানের জীবন বাজি রেখে ছুটে চলা দেখে তাদের মাঝেও মনোবল বেড়েছে। আতঙ্ক দুরে ঠেলে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে চিকিৎসক সেবিকা ও স্বাস্থ্যকর্মীদের উৎসাহ দিয়ে থাকেন। । নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে দায়িত্বকে বড় করে দেখছেন এই চিকিৎসক কর্মকর্তা। রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে নিয়মিত ভিজিট করেন বিভিন্ন ওয়ার্ড। রোগীদের চিকিৎসাসেবার ব্যাপারে খোঁজ খবর নেন। তাদের থাকা বা খাওয়ার বিষয়ে কষ্ট হচ্ছে না কিনা সেই বিষয়েও কথা বলেন রোগী ও স্বজনদের সাথে। এছাড়া তিনি সাধ্যমতো করোনা রোগীদের পাশে থাকার চেষ্টা করেন। করোনার হিমশিম পরিস্থিতি মোকাবেলায় তিনি সর্বোচ্চ ভূমিকা রেখে চলেছেন। স্বাস্থ্যসেবার নানা অপ্রতুলতার মধ্যেও দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তিনি। অফিস সময় শেষ হওয়ার অনেক পরেই তিনি বাড়িতে যান। রোগীদের সমস্যার কথা শুনে তা সামধানের জন্য তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা করেন। চিকিৎসক সেবিকাসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের তিনি নানাভাবে উৎসাহিত করেন। ডা. আখতারুজ্জামান চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা, মানবিকতা ও আন্তরিকতায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
করোনাযোদ্ধা ডা. মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান বলেন, অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ করে চলেছি। করোনার ছোবলে চিকিৎসাধীনরা মৃত্যুর মুখে রয়েছেন। সামান্য অক্সিজেন বিঘœ ঘটলে মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে পারে। তাই দায়িত্ব পালনে রাত দিন বলতে কিছুই নেই। চিকিৎসক- সেবিকারা আপ্রাণ চেষ্টা করেন রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে। তিনি সামনে থেকে কোভিডে দায়িত্বরতদের নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। রেডজোন, আইসিইউ ও এইচডিইউতে চিকিৎসাধীন মানুষের কথা ভেবে রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেননা। চোখের সামনে ভেসে ওঠে করোনার ভয়ে কাতর মানুষের চেহারা। অনেক রাত পর্যন্ত তিনি চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ রাখেন। কারণ তিনি করোনায় আক্রান্ত ছিলেন। এর কষ্টটা তিনি খুব কাছ থেকে টের পেয়েছেন।
ডা. আখতারুজ্জামান আরও জানান, চিকিৎসকের কাজ হলো দুঃসময়ে মানব সেবা করা। করোনা পরিস্থিতিতে পিছু হটলে চলবে না। আমৃত্যু পর্যন্ত মানবসেবা করতে চান তিনি।
উল্লেখ্য, যশোরে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় ২০২০ সালের ২২ এপ্রিল। তিনি ছিলেন মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ১ জন স্বাস্থ্যকর্মী। বর্তমানে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে করোনা রোগী। ২০২১ সালের ৮ আগস্ট পর্যন্ত জেলায় করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ১৮ হাজার ৯৭৮ জন। এরমধ্যে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের ২৮ জন চিকিৎসক ও ৭৫ জন সেবিকা ছিলেন। সাজ্জাদ কামাল নামে একজন চিকিৎসকের মৃত্যু হয়।
Leave a Reply