এনামুল হক রাশেদী, বাঁশখালী(চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি:
চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলায় কোরবানীর মাংস রান্না স্বাদ না হওয়ায় এক গৃহবধূকে তার স্বামি নির্দয়-নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ পাওয়া গেছে। অমানবিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘঠেছে উপজেলার ১ নং পুকুরিয়া ইউনিয়নের চাঁনপুর গ্রামে। নিহত গৃহবধূর নাম আইরিন আক্তার (২১), সে সাধনপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ সাধনপুর গ্রামের আবু ছালেকের মেয়ে। অভিযুক্ত খুনি স্বামির নাম হারুনর রশীদ পুকুরিয়া ইউনিয়নের চাঁনপুর গ্রামের মৃত আহমদ হোসেনের ছেলে।২৪ জুলাই’২১ ইং, শনিবার রাতে বাঁশখালী থানা পুলিশ পার্শ্ববর্তি আনোয়ারা উপজেলা হাসপাতালে স্বামীর ফেলে যাওয়া গৃহবধূর লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করেছেন।ঘটনার বিবরনে প্রকাশ: ২০১৭ সালের ১০ আগষ্ট বাঁশখালী উপজেলার পুকুরিয়া ইউনিয়নের চাঁনপুর গ্রামের মৃত আহমদ হোসেনের ছেলে অটোরিক্সা চালক হারুনুর রশিদের সাথে একই উপজেলার সাধনপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ সাধনপুর গ্রামের আবু ছালেকের মেয়ে ৭ম শ্রেণিতে পড়ুয়া স্কুলছাত্রী আইরিন আক্তারের সাথে বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে আইরিনের শ্বশুড় পরিবারের ইন্ধনে তার যৌতুকলোভী স্বামি হারুন অটোরিক্সা কেনার কথা বলে আইরিনের বাবার কাছ থেকে এক লাখ টাকা যৌতুক দাবী করে আসছিল। আইরিনের দরিদ্র পিতা মেয়ের স্বামির আবদার যথাসময়ে পুরন করতে না পারায় এই টাকা না পেয়ে স্বামী হারুনুর রশিদ প্রায়শঃ আইরিনকে মারধর করে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিত। এই নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, থানা পুলিশ ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে কয়েকদফা সালিসী বৈঠকের ঘটনাও ঘটেছে। প্রতিবার বৈঠকের সুষ্ঠ নিস্পত্তি হলে আইরিন স্বামীর ঘরে ফিরতো। সর্বশেষ গত ২১ জুলাই স্বামী হারুনুর রশিদ স্থানীয় এক প্রতিবেশির দেয়া কোরবানির গরুর মাংস এনে আইরিনকে রান্না করতে দেন। আইরিন রান্না করা মাংস তার স্বামি হারুন এবং স্বজনরা খাওয়ার পর মাংসের স্বাদ ভালো হয়নি অভিযোগ তুলে সুকৌশলে তার স্বামি ও শ্বশুর বাড়ির লোকজন প্রতিবেশিদের ডেকে দেখায়। এর পর স্বামী হারুনুর রশিদ মাংস কেন স্বাদ হয়নি অভিযোগ তুলে আইরিনকে কয়েকদফা বেদম এলোপাতাড়ী পিটিয়ে তার শরীরের বিভিন্নস্থানে জখম করে। এর পর থেকে গৃহবধূ আইরিন নির্যাতনের যন্ত্রনায় এবং অভিমানে ২৪ জুলাই পর্যন্ত ঘরের কাজকর্ম সব করতে থাকলেও ভাত খাওয়া বন্ধ করে দিয়ে অভুক্ত থাকেন। অভূক্ত থাকার অপরাধে দফায় দফায় নির্যাতনে আহত ও ক্লান্ত আইরিনকে ২৪ জুলাই সকাল ৯টায় আবারো নির্মম ও অমানবিকভাবে পিটাতে থাকলে আইরিন এক পর্যায়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। পরিবারের লোকজন গোপনে আইরিনকে বাঁশখালী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে না এনে পার্শ্ববর্তি আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে ওখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক আইরিনকে মৃত অবস্থায় পান। আইরিনের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর হাসপাতালে লাশ ফেলে কৌশলে সবাই পালিয়ে যায়।আনোয়ারা হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবু মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন বলেন, ‘ গৃহবধূ আইরিনকে তার স্বজনরা মৃত অবস্থায় হাসপাতালে এনেছিল। ঘাতক স্বামী হারুনুর রশিদের মা নিহত গৃহবধূ আইরিন আক্তারের শ্বাশুড়ী নুর বানু বলেন,‘ মাংসের রান্না স্বাদ না হওয়ায় আইরিনকে আমার ছেলে পিটিয়েছে ঠিক কিন্তু হত্যা করেনি। আমার ছেলে বলেছে ওড়না পেঁচিয়ে সে আত্মহত্যা করেছে। তবে ঐ সময় আমি ঘরে না থাকায় কিভাবে আইরিন মারা গেছে, কোথায় ওড়না পেঁচানো হয়েছে তা আমি দেখিনি।সাধনপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ সাধনপুর গ্রামের ইউপি সদস্য আব্দুর রহমান বলেন,‘আইরিনের যৌতুকলোভী স্বামী হারুনুর রশিদের অত্যাচারে দফায় দফায় সালিসী বৈঠকে স্বামী হারুনুর রশিদের দোষ প্রমাণিত হত। মূলত যৌতুক না পেয়েই মাংস রান্নার অজুহাতে আইরিনকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে তার স্বামি।আইরিনের বাবা আবু ছালেহ এবং মা শামশুন্নাহার বলেন, ‘ আমার মেয়েকে পিটিয়ে হত্যা করেছে তার পাষন্ড যৌতুকলোভী স্বামী হারুনুর রশিদ। হত্যার পর তারা আমার মেয়ের লাশ গায়েব করার চেষ্টা করেছিল। তাই বাঁশখালী থেকে আমার মেয়ের লাশ আনোয়ারা হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। আমার মেয়ের হত্যার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। বিয়ের ৪ বছরের মধ্যে এক লাখ টাকা যৌতুকের জন্য আমার মেয়েকে তার স্বামি পাষন্ড হারুন ও ভাসুর সিরু কয়েক দফায় নির্মমভাবে পিটিয়ে প্রায় ৫ বার ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল। বাঁশখালীর রামদাশ মুন্সির হাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপ-পরিদর্শক মিনহাজ মাহমুদ বলেন, ‘ আইরিনের মৃত্যুর বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। ময়না তদন্ত শেষে আইরিনের লাশ আইরিনের বাপের বাড়িতে দাফনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইরিনের বাবা-মা। বিষয়টি তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।এদিকে যৌতুকের লোভে একজন গৃহবধূকে নির্মমভাবে হত্যার ঘঠনা জানাজানি হওয়ার পর প্রতিবেশি ও এলাকাবাসীদের মধ্যে প্রচন্ড ক্ষোভ দেখা গেছে। তাদের অনেকেই নির্মম এ হত্যাকান্ডে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করেছে।
Leave a Reply