উৎফল বড়ুয়া, সিলেট:
রাত পোহালেই ঈদুর আজহা। সারা দেশের মতো সিলেটের পশুর হাটে চলছে শেষ মুহূর্তের বেচাকেনা। পশুর দর-দাম নিয়ে এখন চলছে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে টানাটানি।
সিলেটে মঙ্গলবার (২০ জুলাই) দুপুর থেকে বাড়তে শুরু করেছে পশু বিক্রি। প্রতি বছরই সিলেট নগরীর পশুর হাটগুলো ঈদের আগের দিন এসে জমে উঠে। কোনো বছর ভালো দামের অপেক্ষায় থাকা বিক্রেতাদের পড়তে হয় লোকসানে, আবার কোনো বছর ক্রেতারা মনমতো পশু না পেয়ে ফিরেন খালি হাতে। কিন্তু এবার খালি হাতে ফেরা কিংবা বিক্রেতাদের লোকসানের সম্ভাবনা না থাকলেও চলছে দাম নিয়ে টানাটানি।
মঙ্গলবার বিকেলে সরেজমিনে সিলেট নগরীর কাজীরবাজার, শাহী ঈদগাহ এলাকার কালা পাথর মাঠ, মেন্দিবাগ এলাকায় কয়েদির মাঠ ও দক্ষিণ সুরমার পারাইরচকে ট্রাক টার্মিনাল পশুর হাট ঘুরে দেখা গেছে, শেষ সময়ে এসে জমে উঠেছে পশুর হাট। হাটে ভিড় বেড়েছে মানুষের। তবে বিক্রেতারা বলছেন, দাম আশানুরূপ পাচ্ছেন না। আর ক্রেতারা বলছেন দাম তুলনামূলক দাম।
সকল পশুর হাটেই রয়েছে প্রশাসনের বাড়তি নজরদারি। বসানো হয়েছে জাল টাকা শনাক্ত করার যন্ত্র। বার বার মাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ঘোষণা আসছে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই মানছেন না স্বাস্থ্যবিধি।
রংপুর থেকে ৩২টি গরু নিয়ে কাজীরবাজার এসেছেন ব্যবসায়ী মালিক আহমদ। তিনি বলেন, ১১টি গরু বিক্রি করেছি। তবে চাহিদামতো দাম মিলছে না। তবে বাকি থাকা গরুগুলো আজ বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।
অপরদিকে গরু কিনতে দক্ষিণ সুরমার বলদি এলাকা থেকে কালাপাথর মাঠে এসেছেন ইব্রাহীম আহমদ উজ্জ্বল। তিনি বলেন, প্রতিবছর ঈদের আগের দিনই গরু কিনি। দুইটি গরু কেনার ইচ্ছা থাকলেও একটিও কিনতে পারিনি। ব্যবসায়ীরা দাম ছাড়তে চাইছেন না।
সিলেটের সবচেয়ে বড় পশুর হাট কাজীরবাজারের ব্যবস্থাপক শাহদাত হোসেন লুলুন বলেন, বিক্রি অনেক বেড়েছে। এবার এখন যা মনে হচ্ছে তাতে ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনো শঙ্কা নেই। আবার গরুর সংকটও হবে না। তবে ব্যবসায়ীরা দাম ছাড়তে চাইছেন না। তবে শেষ রাতের দিকে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ে একটি সিদ্ধান্তে আসবেন।
অপরদিকে ঈদুল আজহা উপলক্ষে আগেরদিন প্রতিবছর সিলেট নগরে অগণন অবৈধ হাট গড়ে ওঠে। এবারও পাঠানটুলা, সুবিদবাজার, লন্ডনি রোডসহ কয়েকটি স্থানে অবৈধ পশুর হাট গড়ে উঠেছে।
এ ব্যাপারে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (গণমাধ্যম) বি এম আশরাফ উল্যাহ তাহের বলেন, অবৈধ হাট কেউ বসাতে পারবে না। অবৈধ পশুর হাটের বিরুদ্ধে এসএমপি কঠোর অবস্থানে রয়েছে জানালেও করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ চলাকালীন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে সিলেটে বসা কোরবানীর গরুর হাটে বেশীরভাগ মানছেন না স্বাস্থ্যবিধি। কানায় কানায় পূর্ণ প্রতিটি গরু ছাগলের হাটে যেন করোনা সংক্রমণের বাজারে রূপ নিয়েছে। প্রশাসনের তেমন তদারকিও লক্ষ্য করা যায় নি। মানুষের বেশিরভাগ মাস্ক না পড়েই ভিড় ঠেলে গরু দেখতে দেখা গেছে। আবার অনেকের মুখে মাস্ক থাকলেও তা থুতনিতে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
বাজারগুলোতে শুরুতে বেচাকেনা কম হলেও শেষ মুহূর্তে বিক্রি বেড়ে যায়। হাটের সময় ফুরিয়ে আসায় দামও ছাড়তে শুরু করেছেন ব্যবসায়ীরা। ক্রেতারাও স্বস্তিতে কিনেছেন কোরবানির পশু। এবারের গরু বাজারে বেশী বিক্রি হচ্ছে দেশী জাতের গরু। ফার্মের গরুর সংখ্যা বাজারে বেশী থাকলেও তা কেনাবেচা কম দেখা গেছে। বিশেষ করে ৫০ থেকে ৬৫ হাজার টাকা দামের গরু বিক্রি হচ্ছে বেশী।
এদিকে মাঝারি আকৃতির যেসব গরু গত দুইদিন আগে বিক্রি হয়েছে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা সেই গরু শেষদকে বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা দামে। কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, হাটে পশু বিক্রয় কম। এ ছাড়াও অধিক দামের আশায় ব্যবসায়ীরা দূর দূরান্ত থেকে গরু বাজারে এনেছেন। যদি বিক্রি করতে না পারেন তাহলে অনেক বেশী ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। তার চেয়ে ভালো অন্তত মূল পুঁজিটা তুলে নেয়া।
দামের আশায় গত দুইদিন কেউ কেউ পশু বিক্রয় করেনি। এখন ঈদের সময় ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে সবাই দ্রুত পশু বিক্রয়ে তোড়জোড় করায় বিক্রেতারা দাম কম হাঁকাচ্ছেন। এ ছাড়াও গত বছরের তুলনায় করোনায় এ বছর হাটে বিক্রয় কম হচ্ছে। অনেকেই পশু দেখে না কিনে বাড়ি ফিরে গেছে। এ কারণে দাম কমছে।
সরেজমিন দেখা যায়, পশুর হাটগুলোতে স্বাস্থ্যবিধির কোন বালাই ছিল না। অনেকেই মাস্ক ছাড়াই ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে। হাটে ছিল প্রচন্ড পরিমাণের ভিড়।
একস্থান দিয়ে হাটে প্রবেশ করে ওই প্রবেশপথ দিয়েই আবার বের হতে হয় ক্রেতা, বিক্রেতাদের। হাটের প্রবেশ পথগুলোতে হাত ধোয়ার কোনো ব্যবস্থা দেখা যায়নি। এতে করোনা ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কায় আছেন সচেতন মহল। স্বাস্থ্যবিধি মানাতে হাট কর্তৃপক্ষ মাইকে ঘোষণা দিলেও কেউ এসবে গুরুত্ব দিচ্ছেন না বলে দেখা গেছে। এতে করে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপনের পরবর্তী করোনা পরিস্থিতি ভয়ংকর রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা বেশী রয়েছে।
Leave a Reply