তোতা আর নেই বিল্লাল হোসেন,যশোর প্রতিনিধি:
সকলকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন ‘মাঠ সাংবাদিকতা’ ও ‘ক্ষতবিক্ষত বিবেক’ গ্রন্থের লেখক প্রেসক্লাব যশোরের সাবেক সভাপতি প্রথিতযশা সাংবাদিক মিজানুর রহমান তোতা (৬৫)। শনিবার ভোরে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের এইচডিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দৈনিক ইনকিলাবের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন২ জুলাই নিজের ফেসবুক পেজে সর্বশেষ স্ট্যাটাসে সুস্থতার জন্য দোয়া কামনা করে সাংবাদিক মিজানুর রহমান তোতা লিখেছিলেন, ৭ দিন ধরে বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছি। এর মাঝে পেয়েছি যবিপ্রবি থেকে করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট। ভাবলাম ভালো হয়ে গেলাম। এখন আর জ্বর নেই। সব আছে। শরীর দুর্বল থেকে দুর্বল হয়ে পড়েছে। মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছিনা। ডা. বলেছেন ওষূধ খেয়ে যেতে, আরো কিছুদিন এন্টবায়োটিকসহ করোনার। মরহুমের ছেলে শাহেদ রহমান জানান, ওষুধ চলছিলো। এরই মধ্যে ৩ জুলাই মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হওয়ার পর তিনি ( মিজানুর রহমান তোতা) জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। গুরুতর অবস্থায় যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিলে চিকিৎসক তাকে করোনা রেডজোনে পাঠায়। পরে রাত সাড়ে ৯ টার দিকে তাকে নেয়া হয় হাসপাতালের আইসিইউতে। সেখানে তার চিকিৎসাসেবা চলছিলো। শাহেদ রহমান আরও জানান, তার পিতার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হওয়ায় ২ দিন আগে আইসিইউ থেকে পাঠানো হয় হাই ডিফেনডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউ)। সর্বশেষ ঘন্টায় ৪/৫ লিটার অক্সিজেন দিয়ে তার অক্সিজেন স্যাচুরেশন ছিলো ৯৬/৯৭। চিকিৎসক ১/২ দিনের মধ্যে ছাড়পত্র দেয়ার ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছিলেন। কিন্তু শনিবার ভোরে সব কিছু ফেলে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। চিকিৎসক তাদের জানিয়েছেন, ফের মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে মিজানুর রহমান তোতা মারা গেছেন। করোনা রেডজোনের এইচডিইউতে দায়িত্বরত চিকিৎসক আরিফুল ইসলাম জানান, ১৪ দিনের চিকিৎসাসেবায় অনেকটা সুস্থ হয়ে ওঠেন সাংবাদিক তোতা। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ও করোনার উপসর্গ নিয়ে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় দ্বিতীয় বারের মতো মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আরিফ আহমেদ জানান, সাংবাদিক মিজানুর রহমান তোতার নমুনা পরীক্ষায় আরটিপিসিআরের ফলাফলে নেগেটিভ শনাক্ত হয়। কিন্তু ক্লিনিক্যাল ও সিটিস্ক্যান পরীক্ষার ফলাফলে তিনি করোনা পজেটিভ ছিলেন। তার ফুসফুসে ৭৫ ভাগ ইনফেকশন ছিলো। তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বলে জানান আরএমও। তার মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে যশোরের সাংবাদিকরা প্রথমে হাসপাতাল পরে বাড়িতে যান। বাদ জোহর খয়েরতলা জামে মসজিদের সামনে জানাযার নামায শেষে পারিবারিক কবরস্থান যশোর শহরের খয়েরতলায় স্ত্রী রেবা রহমানের পাশে তাকে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তিনি দুই মেয়ে ও এক ছেলেসহ বহু গুনগ্রাহী রেখে গেছেন। ১৯৫৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর তিনি ঝিনাইদহ শহরের চরমুরারীদহে জন্মগ্রহণ করেন। যশোর শহরের নতুন খয়েরতলায় তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন। তিনি অবিভক্ত যশোর সাংবাদিক ইউনিয়নের (জেইউজে) সভাপতি, বাংলাদেশে ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) নির্বাহী সদস্য, প্রেস ক্লাব যশোরের একবার সেক্রেটারি ও তিনবার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন । এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তোতার সহধর্মিনী সাংবাদিক রেবা রহমান আগেই পরপারে চলে গেছেন। বাদ জোহর খয়েরতলা জামে মসজিদে নামাজে জানাযা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। জানাযায় সাংবাদিক, রাজনৈতিক, পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এরআগে বাসভবনের সামনে মরদেহ রাখা হয়। সেখানে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় প্রেসক্লাব যশোর, যশোর সংবাদপত্র পরিষদ, যশোর সাংবাদিক ইউনিয়ন, সাংবাদিক ইউনিয়ন যশোর, জেলা সাংবাদিক ইউনিয়ন, দৈনিক স্পন্দন, গ্রামের কাগজ, দৈনিক সোনালী দিন,ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন যশোর, যশোর সাহিত্য পরিষদ, সাংস্কৃতিক সংগঠন সুরধনী, ওয়াকার্স পাটিসহ (মার্কসবাদী) বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষ। করোনা ভাইরাস প্রার্দুভাবের কারণে তার মরদেহ প্রেসক্লাব, কর্মস্থল ইনকিলাব অফিসে নেয়া হয়নি। মাঠ সাংবাদিকতায় তার জীবন কেটেছে একটানা ৪৫ বছর। এর মধ্যে একটানা ৩৫ বছরই কাটে দৈনিক ইনকিলাবে। ১৯৭৭ সাল থেকেই ছড়া, কবিতা, সংবাদ লেখালেখিতে প্রবেশ। ১৯৭৮ সালে দৈনিক গণকন্ঠের রিপোর্টার, সমাচারের স্টাফ রিপোর্টার, ১৯৭৯ সালে দৈনিক স্ফুলিঙ্গের স্টাফ রিপোর্টার, ১৯৮০ সালে পিআইবির লং কোর্সের প্রশিক্ষণ, তারপর দৈনিক স্ফুলিঙ্গের বার্তা সম্পাদক, দৈনিক ঠিকানায় নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আজাদের স্টাফ রিপোর্টার ও বিশেষ প্রতিনিধি, এর মাঝে সাপ্তাহিক ছুুটি, সাপ্তাহিক পূর্নিমায় খন্ডকালীন লেখালেখি। মূলত তারপর থেকেই দৈনিক ইনকিলাবে কাজ শুরু করেন। মিজানুর রহমান তোতা জীবনের শেষ বয়সে এসে সাহিত্যে বেশি মনোনিবেশ করেন। লিখতে থাকেন সমসাময়িক কবিতা, আত্মজীবনীমূলক গল্প প্রবন্ধ। তোতার প্রথম গ্রন্থ ‘মাঠ সাংবাদিকতা’। প্রকাশ হয় ২০০৮ সালে একুশের বই মেলায়। পরবর্তী প্রকাশনা ছিল ‘ক্ষতবিক্ষত বিবেক’। ২০১৫ সালে আত্মজীবনীমূলক এই গ্রন্থটি প্রকাশ হয়। এরপর ২০২১ সালে প্রকাশ হয় কাব্যগ্রন্থ ‘দিবানিশি স্বপ্নের খেলা’।
মিজানুর রহমান তোতার মৃত্যুতে শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন যশোর জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল ইসলাম মিলন, সাংগঠনিক সম্পাদক ও যশোরের সাবেক পৌরমেয়র জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু, সাবেক প্রচার সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ হারুন অর রশীদ, জেলা যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ মুনির হোসেন টগর, যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা ইয়াকুব কবির প্রমুখ।
Leave a Reply