আতিকুর রহমান, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
যাদুকাটা নামটি শুনলেই শরীরটা ঝিন ঝিন করে ওঠে। তবে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। এটা কোনো তন্ত্র-মন্ত্র বা ভুত-প্রেত ছাড়ানোর যাদু টোনা নয়, সুনামগঞ্জের তিনটি উপজেলার লক্ষাধিক মানুষকে খাবারের যোগান দেয়া যাদুকাটা নদী। যাদুকাটা নদীতে মেঘালয় পাহাড় থেকে ঢলের পানিতে ভেসে আসা বালু উত্তোলন ও পরিবহন করে তিনটি উপজেলার ৫০ হাজার শ্রমিকসহ বিভিন্ন জেলা থেকে জীবন জীবিকার তাগিদে ছুটে আসা আরও ৫০ হাজার শ্রমিক বিভিন্ন উপায়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। সমগ্র বাংলাদেশের হাজার হাজার ব্যবসায়ী এখান থেকে বালু নিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করেন। সরকারের উন্নয়নমূলক কাজগুলোও এখানকার বালু দিয়েই হয়।
মামলা-মোকদ্দমা ও প্রশাসনিক জটিলতায় দুই বছর ধরে বন্ধ থাকা সুনামগঞ্জ জেলার বৃহৎ কর্মস্থল যাদুকাটা বালু মহাল খুলে দেওয়ায় স্বস্তি ফিরে এসেছে এলাকার বেকার বারকি শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের মনে। তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, জামালগঞ্জ অঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ বংশ পরম্পরায় যাদুকাটা নদী থেকে বালু আহরণের পর বিক্রি করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন।
নানান জটিলতায় বিগত দুই বছর বৃহৎ এই কর্মক্ষেত্রটি বন্ধ থাকায় হাজার হাজার শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা মানবেতর জীবনযাবন করেছেন। উপার্জনের বিকল্প পথ না থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে বহু কষ্টে দিনাতিপাত করেছেন তারা। পরিবারের ভরণপোষণ ও সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ চালানো দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছিলো তাদের জন্য।
জানা যায়, দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর এলাকাবাসীর আবেদনের প্রেক্ষিতে বালু মহালটি ইজারা প্রদানের জন্য উদ্যোগ নেয় সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন। চলতি বছরের ২৩মার্চ সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন থেকে ইজারা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন কিছু প্রতিষ্ঠান। তম্মধ্যে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে মেসার্স নিলম ট্রেডিং ও মেসার্স আজাদ হোসেন এন্টারপ্রাইজ ভ্যাট ট্যাক্সসহ ৬কোটি ৭৯ লক্ষ ৮হাজার টাকায় যাদুকাটা-১ (৮৯.৫৬ একর আযতন বিশিষ্ট) ও যাদুকাটা-২(৩৯৮.০৪ একর আয়তন বিশিষ্ট) দুইটি মহালের ইজারাপ্রাপ্ত হয়ে ইজারামূল্যের টাকা সরকারী কোষাগারে পরিশোধ করলেও অপর একটি পক্ষ ইজারা বাতিলের জন্য হাইকোর্টে একটি রিট মামলা দায়ের করেন।রিটের আবেদন শুনানি শেষে জেলা প্রশাসনের দেয়া ইজারা বন্দোবস্ত এক বছরের জন্য স্থগিত করেন হাইকোর্ট। ইজারাদারগণ স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগে আবেদন করেন এবং এলাকার লাখো শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়ার দাবী জানান। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির সমন্বয়ে ৫ সদস্যের পূর্নাঙ্গ বেঞ্চ ১লা জুন আবেদনের শুনানির দিন ধার্য করেন । ওইদিন উভয় পক্ষের কৌসূলীদের উপস্থিতিতে যুক্তি তর্ক উপস্থাপনের পর প্রধান বিচারপতি জেলা প্রশাসনের দেয়া ইজারাবন্দোবস্ত বৈধ বলে ঘোষণা করেন।
ইজারা বন্দোবস্ত বৈধ ঘোষনার পর গত ১২ই জুন দুপুরে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর এমএম রেজাউল করিম ও তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রায়হান কবিরসহ দায়িত্বশীলরা সরেজমিনে গিয়ে যাদুকাটা নদীতে বালু উত্তোলনের জন্য সীমানা নির্ধারণ করে দেন।নদীটি ইজারা হওয়ায় শ্রমিকদের মাঝে আনন্দের শেষ নাই।
Leave a Reply