উৎফল বড়ুয়া, সিলেট:
সিলেটে করোনা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। এই বিভাগে রোগী বাড়ার হার ও পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্ত তুলনামূলক বেশি। মৃত্যুর সংখ্যাও এ অঞ্চলে বুকে কাঁপন ধরানোর মতো।
দেশে করোনা সংক্রমণ শুরুর ১৬ মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও পরিস্থিতি এখন সবচেয়ে খারাপ। সিলেটে সার্বিকভাবে রোগী ও মৃত্যু বাড়ছেই। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দেওয়া দুই সপ্তাহের কঠোর বিধিনিষেধ গত বুধবার শেষ হয়েছে। তবে বিধিনিষেধের ইতিবাচক কোনো প্রভাব এখনো দেখা যাচ্ছে না।
এরই মধ্যে পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে কঠোর বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে। আট দিনের জন্য প্রায় সবকিছু খুলে দেওয়া হয়েছে। সারা দেশের ন্যায় সিলেটেও বৃহস্পতিবার (১৫ জুলাই) দোকানপাট ও বিপণিবিতান খুলে দেওয়া হয়েছে। চলছে গণপরিবহন। শিথিলের প্রথম দিনই সিলেট নগরীতে ছিলো যানবাহনের প্রচন্ড চাপ। বিপণীবিতানগুলোতে মানুষের ভিড়ে পা ফেলা ছিলো দায়। ফলে ঈদের পর সংক্রমণ আরও ভয়ঙ্কর হারে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগওয়ারি হিসাবে দেখা যায়, সিলেটে সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। সিলেটে গত ৩ দিন ধরে শনাক্তের হার প্রায় ৪০ শতাংশ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে- সংক্রমণ পরিস্থিতি এখনো বিপজ্জনক মাত্রায় আছে। বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ায় সিলেটসহ সারা দেশে যাতায়াত ও লোকসমাগম বাড়বে। ফলে ঈদের এক সপ্তাহ পর থেকে সংক্রমণ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। তিনি বলেন, এবার গ্রামে সংক্রমণ বেশি হয়েছে। বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ার পর বড় শহরগুলোতে সমাগম বাড়বে। আবার ঈদে দেশের মানুষের একটি বড় অংশ গ্রামে যাবেন, আবার তাঁরা শহরে ফিরবেন। সব মিলিয়ে গ্রামের পাশাপাশি শহরেও সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।
আজ ৯ জনের মৃত্যুঃ সিলেটে প্রতিদিনই যেন মরণকামড় বসাচ্ছে করোনা। আবারও ২৪ ঘণ্টায় এ ভাইরাসে প্রাণ গেলো সর্বোচ্চ ৯ জনের। এর আগে ৭ জুলাই ও ১৪ জুলাই আরও দুই দিন ৯ জন করে মৃত্যু ঘটেছে সিলেটে।
গত বৃহস্পতিবার (১৫ জুলাই) সকাল ৮টার পর থেকে শুক্রবার (১৬ জুলাই) সকাল ৮টা পর্যন্ত বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় এই ৯ জনের মৃত্যু হয়।
আজ শুক্রবার (১৬ জুলাই) সকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) কার্যালয়ের কোভিড-১৯ কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশনের দৈনিক প্রতিবেদন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত চব্বিশ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সিলেট বিভাগে নতুন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন ৫৮৪ জনের শরীরে। এছাড়া এই চব্বিশ ঘণ্টায় সিলেটে হাসপাতালে ও বাড়ি চিকিৎসাধীন ২৪৩ জন রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছেন। আর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৫ জন করোনা আক্রান্ত রোগী।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী- সিলেট বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হওয়া ৫৮৪ জন নতুন করোনা রোগী নিয়ে সিলেট বিভাগে মোট করোনা প্রমাণিত রোগীর সংখ্যা দাঁড়ালো ৩২ হাজার ১৩ জনে। যাদের মধ্যে সিলেট জেলায় ১৮ হাজার ২০৪ জন, সুনামগঞ্জে ৩ হাজার ৫৩৪ জন, হবিগঞ্জ জেলায় ৩ হাজার ৬০৩ জন ও মৌলভীবাজারে ৪ হাজার ৫৪ জন। এছাড়াও সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২ হাজার ৬১৮ জন।
এদিকে বিভাগে শনাক্ত হওয়া নতুন ৫৮৪ জন করোনা আক্রান্ত রোগীর সর্বোচ্চ ২৫১ জন সিলেট জেলার বাসিন্দা। এছাড়া বিভাগে সুনামগঞ্জ জেলার ৩৮ জন, হবিগঞ্জের ১২০ জন ও মৌলভীবাজার জেলার বাসিন্দা ১১৩ জন। এদিকে সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও ৬২ জন রোগীর করোনা শনাক্ত হয়েছে।
তাছাড়া সিলেটের চার জেলায় র্যাপিড এন্টিজেন টেষ্টের মাধ্যমে ১২৪ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়। তাদের মধ্যে জেলা ভিত্তিক সিলেটে ২৬, সুনামগঞ্জে ৩৮, হবিগঞ্জে ৩৮ ও মৌলভীবাজারে ২২ জন রয়েছেন।
গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৫ জন করোনা আক্রান্ত রোগী। এর মধ্যে সিলেটের বিভিন্ন হাসপাতালে ৩৫ জন, হবিগঞ্জে ১৬ জন, মৌলভীবাজার জেলায় ৪ জন। সব মিলিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ৪৫৯ জন। এর মধ্যে সিলেটের বিভিন্ন হাসপাতালে ৩৩৩ জন, সুনামগঞ্জে ৪৩ জন, হবিগঞ্জে ৪৭ জন ও মৌলভীবাজারে ৩৬ জন ভর্তি রয়েছেন।
একইদিনে সিলেট বিভাগে সুস্থ হয়ে উঠা ২৪৩ জনকে নিয়ে বিভাগে করোনা থেকে সুস্থ হওয়া রোগীর সংখ্যা ২৬ হাজার ১৩৮ জন। যাদের মধ্যে সিলেট জেলায় ১৭ হাজার ৯৩৬ জন, সুনামগঞ্জে ২ হাজার ৯৩৬ জন, হবিগঞ্জ জেলায় ২ হাজার ২৪৫ জন ও মৌলভীবাজারে ২ হাজার ৯৯৯ জন। তাদের মধ্যে গত চব্বিশ ঘণ্টায় জেলায় নতুন করে ১৯২ জন রোগী করোনাকে জয় করেছেন। আর ৫ জন হবিগঞ্জে ও ৪৬ জন মৌলভীবাজার জেলায় করোনা থেকে সুস্থ হয়ে উঠেছেন।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সিলেট বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন ৯ জন রোগী। যাদের ৭ জনই সিলেট ও ১ জন সুনামগঞ্জে ও একজন হবিগঞ্জ জেলার বাসিন্দা। এনিয়ে বিভাগে মৃত্যুবরণ করা মোট রোগীর সংখ্যা ৫৫৫ জন। এর মধ্যে সিলেট জেলার ৪৪৫ জন, সুনামগঞ্জে ৪১ জন, হবিগঞ্জে ২৬ জন, মৌলভীবাজারের ৪২ জন ও সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন।
Leave a Reply