বিল্লাল হোসেন,যশোর প্রতিনিধি:
২ বার বন্ধ ঘোষণার পরও যশোর শহরের ঘোপ জেলরোডের আলোচিত মাতৃসেবা ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কার্যক্রম চলছে। লাইসেন্স, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, দক্ষ সেবিকা, প্যাথলজিস্ট ও পর্যাপ্ত অবকাঠামো সুবিধা না থাকার কারণে আলাদাভাবে অভিযান চালিয়ে মাতৃসেবা বন্ধ ঘোষনা করেছিলো সিভিল সার্জন ডা. শেখ আবু শাহীন ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ডা. মাহমুদুল হাসান। অভিযোগ উঠেছে, নতুন করে নিবন্ধন ও পরিচালনার শর্ত পূরণ না করেই বিতর্কিত এই হাসপাতালটি চালু রাখা হয়েছে। এমবিবিএম পাশ ডা. মোজাম্মেল হক করেন রোগীর অস্ত্রোপচার। আর কথিত সেবিকা পিঞ্জিরা চিকিৎসক সেজে রোগীকে অজ্ঞান করে থাকেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২০ সালের ১২ নভেম্বর যশোরের নির্বাহী ম্যাজিস্টেট ডা. মাহামুদুল হাসানের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমান আদালত অভিযান চালিয়ে নানা অনিয়মের কারণে মাতৃসেবা ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ ঘোষণা করে। এসময় মালিক ডা. মোজাম্মেল হককে ৫ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়। এরআগে অক্টোবর মাসে লাইসেন্স বিহীন মাতৃসেবা ক্লিনিকে অভিযান চালায় স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। এসময় ভুয়া ডিগ্রি ব্যবহারের প্যাডসহ বিভিন্ন কাগজপত্র আগুনে পোড়ানোর পর মাতৃসেবা ক্লিনিকের সকল কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন সিভিল সার্জন ডা. শেখ আবু শাহীন। সরেজমিনে দেখা গেছে, ২ বার বন্ধ ঘোষণা করা মাতৃসেবা ক্লিনিকে অস্ত্রোপচার, চিকিৎসাসেবা প্রদান ও প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা নিরীক্ষাসহ সকল কার্যক্রম চলছে আগের মতোই। লাইসেন্সসহ পরিচালনার কোন শর্ত পূরণ না করে প্রতিষ্ঠানটি চালু রাখা হয়েছে। লাইসেন্স বিহীন মাতৃসেবা ক্লিনিকে মালিক ডা. মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে ডিগ্রি প্রতারণারও অভিযোগ রয়েছে। অভিযানের সময় তার ভুয়া ডিগ্রির কাগজপত্র আগুণে পোড়ানোর পরও তিনি মেডিসিন সার্জারি গাইনী এবং মা ও শিশু রোগের চিকিৎসক পরিচয়ে রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদাণ করছেন। এছাড়া রোগীদের সকল ধরণের অস্ত্রোপচার করছেন ডা. মোজাম্মেল। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ডিগ্রি না থাকলেও তিনি প্রতিনিয়ত অস্ত্রোচার করে চলেছেন। রোগীর অস্ত্রোপচারের আগে অ্যানেস্থিয়ার দায়িত্ব পালন করেন তিনি। আবার মাঝে মধ্যে কথিত নার্স পিঞ্জিরা চিকিৎিসক সেজে রোগী অজ্ঞানের দায়িত্ব পালন করেন। ডা. মোজাম্মেল হক ভিজিডিং কার্ড ও প্রচারপত্রে উল্লেখ করা একটি ডিগ্রি নাম দেয়া হয়েছে ও আরএইচ এন্ড সিএসআই (গাইনী)। বাস্তবে এই নামে কোন ডিগ্রি নেই বলে যশোর মেডিকেল কলেজের একজন গাইনী বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নিশ্চিত করেছেন। বুধবার (২৩ জুন) সরেজমিনে দেখা গেছে, ডা, মোজাম্মেল ছাড়া সেখানে আর কোন চিকিৎসক নেই। সেখানে তিনি একাই সব। ডিপ্লোমাধারী সেবিকাও নেই। কয়েকজন অস্ত্রোপচার করা রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। ছবি তুলতেই সেখানকার দুইজন নারী কর্মচারী তেড়ে আসেন। পরে এই প্রতিবেদককে ডা. মোজাম্মেল হকের চেম্বারে নিয়ে যান। ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রোগীদের ছবি তোলার বিষয়টি শুণে ক্ষুব্ধ হন ডা. মোজাম্মেল। তিনি বলেন, ক্লিনিকে অনিয়ম হলে সিভিল সার্জন দেখবেন। সাংবাদিক অনিয়ম দেখার কে। আমার (ডা. মোজাম্মেল) সাথে কথা না বলে ওয়ার্ডের ছবি তুললেন কেনো। যোগ করেন তিনি। এক প্রশ্নের উত্তরে ডা. মোজাম্মেল হক জানান, লাইসেন্স আছে। কিন্তু সাংবাদিককে দেখতে দেবো কেনো। সব নিয়ম মেনেই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছি। যশোরের সিভিল সার্জন ডা. ডা. শেখ আবু শাহীন জানান, মাতৃসেবা ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স নেই। বন্ধ ঘোষণার পরও কার্যক্রম পরিচালনা করলে প্রশাসনের সহায়তায় মাতৃসেবা ক্লিনিকের মালিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, ডা. মোজাম্মেল হক অনেক আগে থেকেই ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার খুলে চিকিৎসাসেবার নামে জমপেশ প্রতারণা করে আসছে। মাতৃসেবা ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিকের আগে তার নুরমহল ক্লিনিক নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান ছিলো। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে ডা. মোজাম্মেল হকের ভুল অস্ত্রোপচারে এর নারী মারা যান। এই ঘটনায় সিভিল সার্জনের নির্দেশে একটি তদন্ত কমিটি গঠন হয়। কমিটির প্রধান ছিলেন তখনকার সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এমদাদুল হক রাজু। তদন্ত কমিটি ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু ও সেখান নানা অনিয়মের সত্যতা পান। ওই তদন্ত প্রতিবেদন স্বাস্থ্য অধিদফতরে পাঠিয়ে দেয় যশোরের তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. দিলীপ কুমার রায়। তদন্ত প্রতিবেদনে নূর মহল ক্লিনিকের লাইসেন্স বাতিল ও ডা. মোজাম্মেল হকের চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করা হয়। পরে নুরমহলের লাইসেন্স বাতিল কর স্বাস্থ্য অধিদফতর। এর কয়েক দিন পরেই নুরমহলের সাইনবোর্ডের জায়গায় মাতৃসেবা ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সাইনবোর্ড লাগানো হয়।
Leave a Reply