মোঃ সাইফ উদ্দিন রনী, কুমিল্লা ব্যুরো প্রধান:
কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ইছাপুরা গ্রামের কৃষক শাহজাহান মিয়া কৃষি জমি থাকার পরও জমিতে ফলন ফলাতে পারছেন না দীর্ঘ ২০ বছর ধরে। একই অবস্থা একই গ্রামের খোরশেদ মিয়া ও লুতু মিয়ার, পাশ^বর্তী ইউনিয়নেরর খাড়াতাইয়ার ফরিদ মিয়ার। কারন তাদের জমি পড়েছে উপজেলার পয়াতের জলায়। যেখানে বন্যার পানিসহ দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধতা লেগেই থাকে । যার কারনে হয়না কোন ফসলাদি। শুধু তাদেরই এমন সমস্যা নয়। উপজেলার সদর, বাকশীমুল, ষোলনল ও রাজাপুল ইউনিয়নের বিশাল এলাকা নিয়ে সৃষ্ট পয়াতের জলা এমন বিষফোড়া হয়ে দাড়িয়েছিল উপজেলার প্রায় ৫ হাজার কৃষক পরিবারের জন্য। জলাবদ্ধতার জন্য অনাবাদী থেকে যেত ১০ থেকে ১২ হাজার একর আবাদী জমি। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) কুমিল্লা অঞ্চল জানায়, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ, “দেশের এক ইঞ্চি জায়গাও যেন অনাবাদী না থাকে” বাস্তবায়নে পয়াতের অনাবাদী জমিকে আবাদী করার উপযোগি করার জন্য পুনঃখনন করেছে ২৫ কিলোমিটার খাল। যার ফলে এখানে ১০ থেকে ১২ হেক্টর জমিতে হবে চাষাবাদ। উৎপাদন হবে ৩০ হাজার মেট্রিক টন খাদ্য শস্য। আড়াই কোটি টাকা ব্যায়ে খাল খননের পর বছরে উৎপাদিত হবে ৭৫ কোটি টাকার খাদ্য শস্য।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) কুমিল্লা অঞ্চল অফিস সূত্রে জানা যায়, ভারতের ত্রিপুরা থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের বড় অংশ ঘুংঘুর ও পাগলী নদীর মাধ্যমে বুড়িং উপজেলার পীতাম্বর, বলরামপুর ও উত্তর কালিকাপুর মৌজার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয় বাকশীমূল মৌজায় অবস্থিত বাকশীমূল দক্ষিণপাড়া খাল মধ্য পাড়াখাল , উত্তরপাড়া খাল ও তিতুর খাল দিয়ে পয়াতের জলায় প্রবেশ করে এবং পাহাড়ি ঢলের অপর একটি অংশ ঘুংঘুর ও পাগলী নদী হয়ে অনেকগুলো ছোট ছোট শাখা খালের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয় আদর্শ সদর উপজেলার আমড়াতলী ইউনিয়নের মধ্যে অবস্থিত সিঙ্গারিয়া জলা ও হানকিং জলায় প্রবেশ করে। পরবর্তীতে সিঙ্গারিয়া জলা ও হানকিং জলার পানি ভৌগলিক কারণে সদর উপজেলার রসুলপুর ও বুড়িচং উপজেলার বলরামপুর মৌজা হয়ে বৃহৎ পয়াতের জলায় প্রবেশ করে । পূর্বে পাহাড়ি ঢল নেমে যাওয়ার সাথে সাথে প্রাকৃতিক নিয়মে পয়াতের জলার উপরিভাগের পানি পুনরায় ঘুংঘুর নদীতে ফেরত যেত এবং নিচু অংশের পানি তিথি নদী হয়ে বুড়ি নদীতে পতিত হতো। ফলে পয়াতের জলার সংশ্লিষ্ট কৃষকগন তাদের জমিতে সহজেই তাদের আশানুরূপ ফসল ফলাতে পারত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে অবৈধ দখল ও বিভিন্ন অংশে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মানের ফলে ঘুংঘুর ও পাগলি নদীর শাখা খাল সমূহের অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার পথে। ফলশ্রুতিতে পাহাড়ী ঢল ও অতি বৃষ্টির পানি পয়াতের জলায় প্রবেশ করতে পারলেও উপযুক্ত নিষ্কাশন পথের অভাবে আর বের হতে পারে না। ফলে বৃহৎ পয়াতের জলার ১০ থেকে ১২ হাজার একর আবাদি জমিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। আর এ জলাবদ্ধতার কারণে ৫ হাজারের অধিক কৃষক পরিবার তাদের জমিতে ফসল ফলাতে পারতো পারেনা।। তারা কোনক্রমেই রোপা-আমন ধান লাগাতে পারত না। আবার কিছু জায়গায় বোরো ধান আবাদ করলেও আগাম বর্ষনে পাহাড়ী ঢলের ফলে অনেক ক্ষেত্রেই তা ঘরে তুলতে পারে না। এ নিয়ে স্থানীয় কৃষক জমির মালিকরা খাল খাল খননের জন্য দীর্ঘদিন আন্দোলন করে আসছিলেন। তাদের দুঃখ কষ্ট নিয়ে জেলা প্রশাসন, কৃষি মন্ত্রণালয় সহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় অনেক লেখালেখি হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন কুমিল্লা অঞ্চল, জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সংসদ সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাসহ ভুক্তভোগী কৃষকদের নিয়ে দীর্ঘদিনের পয়াতের জলার জলাবদ্ধতা দূরীকরনে খাল পুনঃখনন এর উদ্যোগ গ্রহন করেন। এ বছরের ১১ জানুয়ারি জেলা প্রশাসন, বুড়িচং-বি পাড়া আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মতিন খসরু এ খাল পূনঃখননের কাজের উদ্বোধন করেন। পয়াতের জলার জলাবদ্ধতা দূর করনের খাল খননের কাজ হওয়ায় বোরো মৌসুমে অনেক কৃষক তাদের জমিতে ধান রোপন করেছেন। এ খান খনেনে এখানকার ৫ হাজাররেও বেশী কৃষক তাদরে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বছরে দেশের খাদ্য চাহিদায় ৩০৯স হাজার মেট্রিকটন খাদ্য যোগান দিতে পারবেন বলে আশা করছেন।
এ বিষয়ে পয়াতের জলার জলাবদ্ধতা দূরীকরনরে জন্য জলা বাচাও কৃষক বাচাও আন্দোলনের নেতা ফরিদ উদ্দিন জানান, দীর্ঘ দিনের আন্দ্যোলন ও দাবীর প্রেক্ষিতে সরকার আমাদের দাবী পূরন করে এ খাল পূনঃখনন করায় আরা কৃষরা বেশ খুশি এবং প্রধানমন্ত্রসহ সবাইকে ধন্যবাদ জানাই।
কুমিল্লা কৃষকলীগের আহবায়ক মোঃ খোরশেদ আলম জানান, এ অঞ্চলের কৃষকদের দীর্ঘ দিনের দাবী ছিল ২৫ কিলোমিটার এ খালটি খনন করে দেয়ার জন্য। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিএডিসির প্রকল্পের মাধ্যমে এ খান খনন করে দেওয়ায় কৃষকদের প্রত্যাশা পূরন হয়েছে এবং দেশে খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ন অর্জন ও কৃষকদের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর আশাও পূরন হবে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) কুমিল্লা অঞ্চল এর প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, যেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদী না রাখার কথা বলেছেন সেখানে ১২ হাজার একর জমি অনাবাদী ছিল। মুজিববর্ষে আমরা কৃষকদের এ অনাবাদী জমিকে আবাদী করার জন্য এ খাল খননের উদ্যোগ গ্রহন করি। কৃষি মন্ত্রনালয়, জেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ কৃষকদের সহযোগিতায় আমরা এ খাল খনন করি। এ খাল খননের ফলে ১২ হাজার একর আবাদের আওয়াতায় আসবে যার ফলে অতিরিক্ত ৩০ হাজার মেট্রিকটন অতিরিক্ত খাদ্য শস্য উৎপাদন হবে এবং ৫ হাজার কৃষক পরিবার উপকৃত হবে।
Leave a Reply