বিল্লাল হোসেন,যশোর প্রতিনিধি:
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালকে ঘিরে গড়ে গড়ে ওঠা অবৈধ দেশ ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসাসেবার নামে মহাপ্রতারণা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিগত দিনে এই প্রতিষ্ঠানে ভ্রাম্যমান আদালত একাধিকবার অভিযান চালিয়েছে। এরমধ্যে তিনবারে সাড়ে ৩ লাখ টাকা জরিমানা গুনেছে মালিক পক্ষ। কিন্তু তারপরও প্রতারণা থামেনি। অভিযোগ উঠেছে, ধেশ ক্লিনিকে মানসম্মত অপারেশন থিয়েটার ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য উন্নতমানের কোনো যন্ত্রপাতি নেই। প্যাথলজি পরীক্ষা নিরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট তৈরি করে রোগী ও স্বজনদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। রিপোর্টের প্যাডের নিচে লিখে নাম বিহীন মেডিকেল অফিসার সম্বলিত একটি সিল মেরে নিজেরাই স্বাক্ষর করে রোগীদের হাতে ধরিয়ে দিচ্ছেন। সিভিল সার্জন ডা. শেখ আবু শাহীন জানিয়েছেন, সেখানে চিকিৎসাসেবার পরিবেশ না থাকায় লাইসেন্স পাওয়ার অযোগ্য বলে স্বাস্থ্য অধিদফতরে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তিন নম্বর গেটের সামনেই আন্ডার গ্রাউন্ডে অবস্থিত দেশ ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার। ক্লিনিকটি পরিচালনার মূলে রয়েছেন খোকন আলী ও রাজু আহমেদ। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সূত্রে জানা গেছে, দেশ ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছে কয়েক বছর আগে। বর্তমানে অবৈধভাবে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম চলছে। অভিযোগ রয়েছে, এটি একটি নাম সর্বস্ব স্বাস্থ্যকেন্দ্র। এখানে নেই বিশেষ চিকিৎসক, ডিগ্রিধারী সেবিকা, মেশিনারীজ, প্যাথলজিস্ট, ল্যাব ওটেকনিশিয়ান। অথচ ১০ শয্যার ক্লিনিকে ১৫ টি শয্যা পাতানো হয়েছে। এছাড়া কেবিন রয়েছে ৩ টি। যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে আসা রোগীর উপর ভর করে দেশ ক্লিনিক খুলে রাখা হয়েছে। সরকারি হাসপাতালের সামনে হওয়ায় দালালরাও রোগীর সাথে প্রতারণা করার সুযোগ পাচ্ছেন খুব সহজেই। বর্তমানে অবৈধ দেশ প্রতারণার শীর্ষে রয়েছে। ক্লিনিকের ভেতরে গিয়ে চোখে পড়ে নামমাত্র অপারেশন থিয়েটারের। যা ব্যবহারে অনুপযোগী। ১৫০-২০০ বর্গফুটের একেকটি কক্ষকে ওয়ার্ডে রুপান্তর করা হয়েছে। মহিলা ও পুরুষ ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে একাধিক শয্যা। অর্থাৎ রোগী প্রতি ৫০ বর্গফুট জায়গাও বরাদ্দ নেই। দালালের মাধ্যমে ভাগিয়ে আনা রোগী ও স্বজনেরা গাদাগাদি করে থাকছেন। অথচ বেড ভাড়া বাবদ হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে টাকা । প্যাথলজি বিভাগে কাউকে পাওয়া যায়নি। সরঞ্জামগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। চিকিৎসকের খোঁজ করেও পাওয়া যায়নি। অথচ সেখানে একাধিক চিকিৎসকের সাইনবোর্ড ঝুলানো রয়েছে। গত কয়েকদিনের অনুসন্ধানে মিলেছে নানা অনিয়মের তথ্য। কথা প্রসঙ্গে এক রোগীর স্বজন জানান, তার রোগীকে এখানে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করানো হয়েছে। কিন্তু সিজার করার পর আর কোন ডাক্তারের দেখা মেলেনি। কোন ডাক্তার সিজার করেছেন জানতে চাইলেও নাম বলা হচ্ছে না। পরিচিতি একজনের মাধ্যমে এখানে রোগীকে আনা হয়েছে। আশাদুল ইসলাম নামে একজন জানান, বৃহস্পতিবার (১ মার্চ) তিনি এসেছিলেন যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে। সেখান থেকে এক যুবক তাকে দেশ ক্লিনিকে ডেকে আনেন। তার রোগীর চিকিৎসা পরীক্ষা নিরীক্ষা বাবদ হাতিয়ে নেয়া হয়েছে আড়াই হাজার টাকা। প্যাথলজি রিপোর্টের কাগজে দেখা গেছে একজন নাম বিহীন মেডিকেল অফিসারের একটি সিলের উপর স্বাক্ষর করা রয়েছে। সূত্র জানায়, নিজস্ব প্যাথলজিস্ট বা চিকিৎসক না থাকাই কম্পিউটারে ফরমেট করে রাখা প্যাডের উপর নিজেদের ইচ্ছা মতো প্যাথলিজর রিপোর্ট তৈরি করে তা রোগীদের মাঝে দেয়া হয়। এছাড়া চিকিৎসকের প্যাড তৈরি করে মালিক পক্ষ নিজেরাই ডাক্তার সেজে রোগীর চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। সূত্রটি আরও জানায়, ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দেশ ক্লিনিকে ভ্রাম্যমান আদালত অভিযান অভিযান চালিয়ে ১ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করেন। এরপর প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নেয়ার জন্য দুই সপ্তাহ সময় বেধে দেয়া হয়। কিন্তু ৩ বছর পার হলেও দেশ ক্লিনিকের লাইসেন্স নবায়ন হয়নি। এরপর ২০১৮ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নূরুল ইসলামের নেতৃতে ¡দেশ ক্লিনিকে ভ্রাম্যমান আদালত অভিযান চালায়। এসময় চালিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত দেখতে পান- ক্লিনিকে কোনও ডাক্তার নেই, একজন ডাক্তার সেজে ক্লিনিক চালান, এছাড়াও নেই কোন ও বিশেষজ্ঞ নার্স। এসময় মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ও চেতনানাশক দ্রব্য উদ্ধার হয়। এসময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নূরুল ইসলামের নির্দেশে মালিককে দুই লাখ টাকা জরিমানা করে তা আদায় করা হয়। অভিযানে আদালতের পেশকার শেখ জালাল উদ্দিন জানান, ২০০৯ সালের জাতীয় ভোক্তাধিকার আইনের ৫৩ ধারায় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করে তা আদায় করা হয়েছে। অভিযানকালে সিভিল সার্জন অফিসের প্রতিনিধি ডা. মীর আবু মাউদ উপস্থিত ছিলেন। ২০২০ সালের ২৩ ডিসেম্বর ফের অভিযান চালায় ভ্রাম্যমান আদালত। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুল হাসানের নেতৃত্বে এই অভিযান চালানো হয়। সেখানে বিভিন্ন প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষায় টাঙানো মূল্য তালিকা চেয়ে বেশি টাকা নেয়ার অভিযোগে মালিক পক্ষের রাজু আহমেদকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। একের পর এক জরিমানার টাকা গুনেও সেখানে প্রতারণা চালানো হচ্ছে আগের মতো। আবুল কাশেম নামে একজন অবৈধ দেশ ক্লিনিকের লাইসেন্স নবায়ন করার জন্য বিভিন্ন মহলে তদবির করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। মুঠোফোনে কথা হয় পরিষ্ঠানের মালিক পক্ষের খোকনের সাথে। তিনি সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন দেশ ক্লিনিকে কোন প্রতারণা নেই। চিকিৎসক সেবিকা ও প্যাথলজিস্ট সব আছে। লাইসেন্স নবায়ন করার জন্য আবেদন করা আছে। যশোরের সিভিল সার্জন ডা. শেখ আবু শাহীন জানিয়েছেন, দেশ ক্লিনিকের বিষয়ে নানা অভিযোগ জানলাম। খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরও জানান, বিগত দিনে লাইসেন্স নবায়ন করার জন্য কর্তৃপক্ষ আবেদন করার পর পরিদর্শনে গিয়ে নানা অনিয়ম চোখে পড়ে। তখন লাইসেন্স পাওয়ার অযোগ্য বলে স্বাস্থ্য অধিদফতরে মতামত পাঠানো হয়। দেশ ক্লিনিকের মালিক লাইসেন্স পাওয়ার জন্যস্বাস্থ্য অধিদফতরে পক্ষ ফের আবেদন করেছেন।
Leave a Reply