আরিফ খান, বেড়া পাবনাঃ
পাবনা বেড়া উপজেলার রুপপুর
ইউনিয়নের ধর্মগঞ্জ গ্রামে অবস্থিত পাটকাঠি পুড়িয়ে কালি (কার্বন)
তৈরির একটি কারখানা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া ও ছাইয়ে রুপপুর,
ভাটিকয়া, বৃন্দ পাড়া, উজানকয়া,হঠাৎপাড়া গ্রামের ৩০ হাজার মানুষ
অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন।
এসব এলাকার বাসিন্দারা শ্বাসকষ্ট রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং মাঠের
গাছপালা ও ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এলাকাবাসী পরিবেশ দূষণ ও ফসল রক্ষার্থে বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ
দিয়েছেন তাতেও কোন ফল হচ্ছে না বলে জানা গেছে।
গত শুক্রবার রুপপুর ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডের ধর্মগঞ্জ গ্রামে সরেজমিনে
গিয়ে দেখা গেছে, কারখানার চারপাশে ফসলি জমি ও আবাসিক এলাকা।
কারখানার আশ পাশের পুকুরের পানি কালো হয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে
গেছে। এ ছাড়া ওই এলাকার ফসল মাটি ও গাছগুলো কালো হয়ে গেছে।
কারখানার ১৬ টি চুল্লিতে পাটকাঠি পুড়ানো হয় এবং নতুন আরও ১৬ টি
চুল্লি তৈরী করা হচ্ছে।
এলাকাবাসি জানান, আবাসিক এলাকায় দুই বছর আগে সাত বিঘা
ফসলি জমিতে ‘ইয়াং বাংলা ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাষ্ট্রিজ কোং লিঃ’
নামের একটি কারখানা স্থাপন করেন কাশিনাথপুর এলাকার আমিনুল ইসলাম
নামের এক ব্যাক্তি। ওই কারখানায় বিশাল আকারের ১৬ টি চুল্লিতে
পাটকাঠি পুড়িয়ে কালি তৈরি করা হয়। এর ফলে প্রচুর ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়।
ওই ধোঁয়া ও ছাইয়ে আক্রান্ত হয়ে এলাকাবাসী হাঁচি-কাশিসহ বিভিন্ন
রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। ইতিমধ্যে এলাকার বৃদ্ধ ও ছোট শিশুদের শ্বাসকষ্ট
জাতীয় রোগ দেখা দিয়েছে। ওই এলাকার তিন ফসলি জমিতে ফসলের ব্যাপক
ক্ষতি হচ্ছে বলে জানায় এলাকাবাসি।
স্থানীয় কৃষক আকরাম আলী জানান, ‘রাত নয়টা থেকে ভোর পর্যন্ত সোলা
পোড়ানো হয়। তখন আমাগেরে এলাকা কালো ধোঁয়ায় ভরে যায়। এলাকার
মানুষ ঠিকমতো নিঃশ্বাস পর্যন্ত নিতে পারেন না। ফসলের ক্ষতি হচ্ছে এ বছর
আমাগেরে আম গাছে মুকুলও আসে নাই গাছের সব পাতা কালা হয়া
গেছে। মাঝে মাঝে মনে হয় বাড়ি ঘড় বেইচা দিয়ে অন্য গেরামে চলে যাই।
স্থানীয় গৃহবধূ আকলিমা খাতুন জানান, আমার স্বামী সারাদিন ভ্যান
চালায় সারাদিন কষ্ট করে আইসা একটু আরামে ঘুমাবে তাও পারে না। রাত
হলেই ধোঁয়া আর ছাইয়ে অন্ধকার হয়ে যায়। ঘড়ের টিন কালা হয়া গেছে
জানালায় ছালা দিয়ে আটকা রাখছি ঘরে ছাই আসে ভাত খেতেও পারিনা
আমরা। নিশ্বাস নিতে পাড়ি না চোঁখ পোড়ে। দুইটা বছর খুুব অশান্তির
মধ্যে আছি আমরা।
আমিরন খাতুন জানান, আমাদের বাড়িতে আমার মেয়ের একটা ছেলে
হয়েছিল সাত দিনেই জামাই বাড়ি পাঠা দিছি। আমার নাতি ধোঁয়ার
কারণে ঠিকমতো নিঃশ্বাস নিতে পারে নাই। মেলা দিন হাসপাতালে ভর্তি
আছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কারখানায় চুল্লি জালানোর কাজ করা এক
শ্রমিক জানান, ‘এ কাজ একটানা কয়েকদিন করা যায় না। নাক মুখ বন্ধ
হয়ে যায় খাওয়ার প্রতি চাহিদা থাহে না, ঘুম হয় না। খুব অভাবি শ্রমিক
ছাড়া এ কাজ কেউ করতে আসে না।’
কারখানার প্রধান পরিচালক আমিনুল ইসলাম জানান, কালো ধোঁয়ায়
পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘শুরুতে ১৮
ফুট উঁচু চুল্লি বসানো হয়েছে। তবে আমাদের প্রজেক্ট কাজ চলমান
রয়েছে আশা করছি কিছুদিনের মধ্যেই এ সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।
ছাই উড়ে ফসলের ক্ষতির বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।
আমিনুল ইসলাম আরও জানান, এই কারখানায় ৪০ কেজি পাটকাঠি পুড়িয়ে
১০ কেজি কালি (ছাইয়ের গুঁড়া) উৎপাদন করা হয়। এই কালি সাড়ে বারো
কেজি ওজনের বস্তায় ভরে চীনে তাদের মূল কোম্পানিতে পাঠানো হয়।
রুপপুর ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হাসেম উজ্জল বলেন, ‘কালি তৈরীর কারখানার
বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা গ্রহনের জন্য ওই এলাকাবাসি আমার কাছে ও প্রশাসনের
বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। এতে কোন কাজ হচ্ছে না। এ
বিষয়ে আমি আপনাদের মাধ্যমে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা
করছি।’
বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ
জাহিদ হাসান সিদ্দিক জানান, ‘ কালো ধোঁয়া বাতাশে মিশে কার্বন
মনো-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যায়। এ ধোঁয়া ফুসফুসে গেলে
শ্বাসকষ্টসহ ফুসফুসের বিভিন্ন জটিল রোগ হতে পারে। এটা দীর্ঘস্থায়ী
হলে ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাওয়ায়
বমির প্রবণতা দেখা দিতে পারে।’
বেড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোঃ সবুর আলী বলেন, বেড়া
উপজেলায় আমি সদ্য যোগদান করেছি। এ বিষয়ে আমার জানা ছিল না।
খোঁজ খবর নিয়ে দেখব, যদি কারখানা অবৈধভাবে হয়ে থাকে ও জনস্বাস্থ্যের
জন্য ক্ষতিকর হয় তাহলে কারখানার বিরুদ্ধে আইনানুক প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা
নেয়া হবে।
Leave a Reply