আনোয়ার সাদত জাহাঙ্গীরঃ ময়মনসিংহঃ
ভাষা আন্দোলনে গৌরবদীপ্ত অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ভাষা সৈনিক, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক,সুনামধন্য সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম শামসুল হককে ২০২১ সালের অমর একুশে পদক (মরনোত্তর) প্রদান করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০ ফেব্রুয়ারি গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন প্রান্তে যুক্ত হয়ে ‘একুশে পদক-২০২১’ প্রদান অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করেন। এসময় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল হক এমপি অনুষ্ঠানে ‘গৌরবদীপ্ত অবদানের’ স্বীকৃতি হিসেবে এম শামসুল হকের সন্তান গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ এমপির হাতে এ পদক তুলে দেন।
এছাড়াও আরো ২০ জনকে ২০২১ সালের একুশে পদক তুলে দেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী।
ফুলপুর-তারাকান্দার কৃতিসন্তান পাঁচ বার নির্বাচিত সংসদ সদস্য, ভাষা সৈনিক মরহুম শামসুল হক ১৯৩০ সালের ২৯শে জানুয়ারী ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার কামারিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন । ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে ময়মনসিংহ শহরে মিছিল শেষে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং ঐ মিছিলে শামছুল হকের পাশে থাকা তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু অমলেন্দু বাবু পুলিশের গুলিতে শহীদ হন । পরবর্তীতে ৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের অংশ হিসেবে ময়মনসিংহ শহরে বিশাল মিছিল নিয়ে বের হওয়ায় তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের হাতে গ্রেফতার হন এবং কারাবরণ করেন । কেন্দ্রীয় ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলন কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে মিছিল-মিটিং, পথসভা, পোস্টারিং, লিফলেট বিতরণসহ নানামুখী আন্দোলনের তিনি নেতৃত্ব দেন । ভাষা সৈনিক শামছুল হক কখনো পায়ে হেঁটে, সাইকেলে চড়ে, কখনো বা গরুর গাড়েতে চড়ে অতিকষ্টে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভাষা আন্দোলনের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন ।
ময়মনসিংহে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণে ভাষা সৈনিক শামসুল হক সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন । বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী প্রচারণা এবং ১৯৬২ সালে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট বাতিলের দাবিতে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তুলেন । ঐতিহাসিক ৬ ও ১১ দফা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে তিনি নির্বাচিত হন । পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন । ১৯৯৭১ সালের ২ মার্চ সকাল ১০টায় ময়মনসিংহের টাউন হল চত্বরে পাকিস্তানের পতাকা পোড়ানো এবং বাংলাদেশের নকশা খচিত পতাকা উত্তোলন আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন ।
১৯৭৩ সালে জাতীয় নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন । ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের পর বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ তথা ময়মনসিংহের জেলা আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ন অবদান রাখেন । তিনি ১৯৭০, ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে সংসদ সদস্য এবং ১৯৮৯ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ফুলপুর উপজেলার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে পাট মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ছিলেন । ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগ ও ময়মনসিংহ জেলা শ্রমিকলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন । তিনি বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠনের সংগঠকের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন ।
ময়মনসিংহের ফুলপুর-তারাকান্দা উপজেলার সকল উন্নয়নমূলক কাজের জন্য সকলের কাছে সজনপ্রিয় এ নেতা শিক্ষা বিস্তারে অসংখ্য স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, তার নামে ময়মনসিংহ নগরীর টাউন হলে ভাষা সৈনিক শামছুল হক চত্তর সহ রয়েছে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, পাঠাগার সহ বিভিন্ন ক্রীড়া সংস্থা ও অসংখ্য সামাজিক সংগঠন। বৃহত্তর ময়মনসিংহের এ কৃতি সন্তানকে নিয়ে ময়মনসিংহবাসী গর্ববোধ করেন।
Leave a Reply