যশোর জেলায় দন্ত চিকিৎসার নামে মহাপ্রতারণা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। চিকিৎসাসেবায় থাকা কেউ কেউ ভুয়া ডিগ্রি ব্যবহার করে নামের আগে ডাক্তার লিখেছেন। এছাড়া ডেন্টিস্টও চিকিৎসক পরিচয়ে প্রতারণার ফাঁদ পেতেছেন। মানুষ না বুঝেই চিকিৎসার জন্য ওই প্রতারকদের কাছে ছুটছেন। তাদের অপচিকিৎসায় অনেকে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। ভুয়া চিকিৎসকদের দৌরাত্মে ডেন্টাল সার্জনদের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। ডেন্টাল সার্জনস ফোরাম যশোরের নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ সোচ্চার হলেই ভুয়া চিকিৎসকরা প্রতারণা করার সাহস দেখাবে না।
ডেন্টাল সার্জনস ফোরাম যশোরের সাধারণ সম্পাদক ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, যশোর জেলায় মোট ৪৯ জন ডেন্টাল সার্জন রয়েছেন। তারা হলেন ডা. ইয়াকুব আলী মোল্লা, ডা.মাহবুবুর রহমান, ডা. শামীম আহমেদ, ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন, ডা. ইয়াসির আরাফাত, ডা. বিধান কৃষ্ণ সাহা, ডা. মাজহারুল ইসলাম রিপন, ডা. মতিউর রহমান সোহাগ, ডা. তানভীর হায়দার তমাল, ডা. নাসিম জামান রিফাত, ডা. শুক্লা রহমান, ডা. শের আলী, ডা. মীনাক্ষী বিশ্বাস, ডা. আমির হোসেন শান্ত, ডা. আয়েশা সিদ্দিকা, ডা. সগির আহমেদ, ডা. বিশ্বজিৎ ব্যানার্জি, ডা. ভুইয়া আলম, ডা. সৈয়দ মাহাবুবুল হাসান, ডা. সুপ্রিয়া দাস প্রিয়াঙ্কা, ডা. শামসুজ্জামান সোহাগ,
ডা. আবু নঈম, ডা.মাহফুজা শারমীন বর্ষা, ডা.সাবিহা তানজিম, ডা. সালাউদ্দিন আল আজাদ সোহাগ, ডা.সখিনা খানম, ডা.এ এইচ এম ফরহাদ রেহান, ডা. রাজিয়া সুলতানা, ডা. আনোয়ার হোসেন পল্লব, ডা. আমেনা রহমান রিমু, ডা. ফাহমিদা দিলশাদ ফারাহ,ডা. বিউটি রাণী বিশ্বাস, ডা. মনজুরুল আহসান মুন, ডা. রুকাইয়া লিমা, ডা. আফসানা ফেরদৌস প্রভাতী, ডা. শেখ নাসিমুজ্জামান ডা. মাহামুদুল হাসান কানন, ডা. আরিফুল ইসলাম, ডা. মাহথির মোহাম্মদ, ডা.আবু তাহের, ডা. সাকি শিরিব, ডা. দিপঙ্কর, ডা. সিফাত ই মোস্তফা, ডা. বিজয় ডা. উমির্, ডা. তামান্না শান্তা উর্মি, ডা. আফসানা ফেরদৌস, ডা. হুস্না হাফিযা আসমা ও ডা. সাদিয়া সুমাইয়া। এর বাইরে যশোর জেলায় ডেন্টাল সার্জন আছে বলে মনে হয়না। কিন্তু জেলায় ৩শ’ বেশি প্রতিষ্ঠানে দন্ত চিকিৎসা চলছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসক নেই। কেউ ভুয়া ডিগ্রি ব্যবহার করছেন। কোন কোন প্রতিষ্ঠানে ডিপ্লোমা ও ডেন্টিস্ট চিকিৎসক সেজে রোগীর দাতে ব্যথা, দাত তোলা, স্কেলিং, ফিলিং (লাইট কিউরসহ),
দাত বাধানো (পিডি,সিডিসহ), উচু ও বাকা দাত সমান করা,রুট ক্যানেল জিনজি ভাইটিস, দাতের গোড়া হতে রক্ত পড়াসহ নানা রোগের চিকিৎসা প্রদান করছেন। যা রোগীদের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ। এসব প্রতারকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের সামনে বেসরকারি একটি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের নাম স্ক্যান হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এই প্রতিষ্ঠানের এক কোণে রয়েছে নিরাময় ডেন্টাল কেয়ার নামে একটি প্রতিষ্ঠান। সেখানে দন্ত চিকিৎসক পরিচয়ে রোগীদের চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার করছেন আলী আহমেদ নামে একজন। অবশ্য তাকে সাপোর্ট দিচ্ছেন শাসমুজ্জামান সোহাগ নামে একজন ডেন্টাল সার্জন। তাকে ঢাল হিসেবে রেখে আলী আহমেদ চিকিৎসা প্রতারণা জোরদার করেছেন। রোববার দুপুরে নিরাময় ডেন্টাল কেয়ারে গিয়ে দেখা যায় আলী আহমেদ এক রোগীর অস্ত্রোপচার করছেন। কিন্তু কোন চিকিৎসা সনদ দেখাতে পারেননি তিনি।
যশোর শহরের চৌরাস্তা এলাকায় বিশ্বাস ডেন্টাল ছলছে সার্জন ছাড়াই। সেখানে ডিগ্রি ছাড়াই চিকিৎসাসেবাসহ সকল কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বাবিন বিশ্বাস। বারান্দীপাড়া ঢাকা রোডে জিল্লুর রহমান চিকিৎসক পরিচয়ে প্রতারণা করছেন। পালবাড়ি মোড় ও নীলগঞ্জ এলাকায় দুই ভাই আব্দুল কাদের ও হারুন অর রশিদ দুটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। তারা দুই ভাইয়ের একজনও চিকিৎসক না। সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি বাজারে রাজধানী ডেন্টাল নামে একটি প্রতিষ্ঠান খুলে বসেছেন কে এম হাসিবুল ইসলাম।
তিনি নামের আগে ডা. ও পরে এলডিডিএস (ঢাকা) ডিগ্রি ব্যবহার করেছেন। কয়েক বছর ধরে কেএম হাসিবুল ইসলাম ডাক্তার পরিচয়ে রোগীদের সাথে প্রতারণা করছেন। এলডিডিএস ডিগ্রির বিষয়ে কে এম হাসিবুল ইসলাম জানান, তিনি ঢাকার মিরপুর থেকে লোকাল ডিপ্লোমা কোর্স করেছেন। তবে পাশ করা প্রতিষ্ঠানের নাম বলতে পারেননি তিনি। হৈবতপুর ইউনিয়নের সাতমাইল-বারীনগর বাজারের শাহবাজপুর রোডে মাত্র ৫ গজের ব্যবধানে শাহআলম ওরফে বাবুল বারীনগর ডেন্টাল, আলমগীর কবীর আজাদ ডেন্টাল কেয়ার প্রতিষ্ঠা করেছেন।
নিজেরাই ডাক্তার সেজে বসেছেন। তারা ভুয়া ডিগ্রি ব্যবহার করে গ্রামাঞ্চলের মানুষকে বোকা বানিয়ে প্রতারণা করছেন। এমবিবিএস পাস না করেও তারা ডাক্তার সেজে প্রতিষ্ঠানের সামনে বড় বড় সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছেন প্রতারনা জোরদার করার জন্য। মূলত তারা কেউ চিকিৎসক নয়। সকলেই চিকিৎসকের সহকারী (ডেন্টিস্ট)। দাতের বিভিন্ন চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার করছেন। বাঘারপাড়া উপজেলা শহরের চৌরাস্তা মোড়ের মুজিব সড়ক মার্কেটে অবস্থিত মোল্লা ডেন্টাল কেয়ার এন্ড চাঁদসী ক্ষত চিকিৎসালয় নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
এখানে চিকিৎসক পরিচয়ে রয়েছেন ডা. মনিরুল ইসলাম । ব্যবস্থাপত্রে তিনি তার ডিগ্রি উল্লেখ করেছেন ডিডিটি (ঢাকা)। যা বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) কর্তৃক স্বীকৃত কোন ডিগ্রি না। গোটা জেলায় দন্ত চিকিৎসার নামে এভাবে প্রতারণা চালানো হচ্ছে।
যশোরের সিভিল সার্জন ডা. শেখ আবু শাহীন জানিয়েছেন, ডেন্টিস্ট কোন ডিগ্রি নয়। তারা চিকিৎসকের সহকারী। বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) কর্তৃক স্বীকৃত ডিগ্রি ছাড়া কেউ নামের আগে ডাক্তার লিখতে পারবেন না। এমনকি ডিপ্লোমা কোর্স করেও চিকিৎসক পরিচয় দিতে পারবেন না।
কেবলমাত্র এমবিবিএস ও বিডিএস পাশ করলেই তিনি ডাক্তার। জেলায় চিকিৎসক পরিচয়ে দন্ত চিকৎসায় প্রতারণার বিষয়ে শুনলাম। অবশ্যই এসব প্রতারকদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
Leave a Reply